কোনো ভাষাকে অমর্যাদার অধিকার কারো নেই : জামায়াত আমির

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, পৃথিবীর সব ভাষায়ই আল্লাহ নবী পাঠিয়েছেন। সব ভাষাই গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো ভাষা অমর্যাদা করার অধিকার কারো নেই।

রোববার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহীদ দিবস উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘পাকিস্তানের তৎকালীন শাসকরা বাংলা ভাষার অমর্যাদা করেছিলেন, ভাষার অধিকার কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তার প্রতিবাদেই আন্দোলন গড়ে উঠেছিলো।’

তিনি বলেন, ‘বেশিরভাগ মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়ার চেষ্টা প্রতিবাদে ‘৫২ সালের ভাষা আন্দোলন হয়েছিলো। মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল। জীবন দিয়েছিলো। আজ দেশে ভাষা আছে কিন্তু কথা বলার অধিকার নেই। গণতন্ত্র নেই, মানুষের ভোটের অধিকার নেই। তখন যেভাবে মানুষ পাকিস্তানের জুলুমের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে এসেছিল, আজও তরুণদের সেভাবে রাজপথে নেমে আসতে হবে।’

ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিবাহিত হয়েছে। পাকিস্তানের স্বাধীনতার ৭৩ বছর হয়েছে। যারা পাকিস্তানের স্বাধীনতার জন্য নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদের শ্লোগান ছিলো, পাকিস্তানের সংবিধান হবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। কুরআন-ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তারা জনগনের সমর্থন নিয়েছিল। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা তাদের ওয়াদা থেকে সরে গেলো।’

তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের চারটি প্রদেশের মধ্যে তিনটিই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। আর একটি প্রদেশ নিয়ে ছিল পূর্ব পাকিস্তান। কিন্তু ওই তিনটি প্রদেশের চেয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল বেশী। বিবেকের দাবি ছিল, পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হলে বাংলাই হবে প্রধান ভাষা। তা না হলে অন্যতম রাষ্ট্রভাষাও করা যেতো। কিন্তু পাকিস্তানে সে সময় যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তানে যারা ছিলেন, তারা ইনসাফের ভিত্তিতে বিষয়টি দেখলে, তাহলে এমনটি হতো না। অধিকার কেড়ে নেয়ার কারনে এদেশের মানুষ প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘দেশে ইতিহাস বিকৃতির কথা ঘনঘন উচ্চারিত হয়ে। কিন্তু যারা ইতিহাসের ওপর বারবার ছুরি চালিয়েছেন, তারাই আজ ইতিহাস বিকৃতির কথা বলেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভূমিকাকে বাদ দিলে, ডাকসুর ভূমিকাকে বিয়োগ করে, অধ্যাপক গোলাম আযমের নাম মুছে ফেললে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসই থাকে না।’

তিনি বলেন, ‘ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা পাশবিক চিন্তা ছাড়া আর কিছুই না। কিছু মানুষ ইতিহাস থেকে কাউকে মুছে দিতে চাইলে, তা হতে পারে না। অধ্যাপক গোলাম আযমকে অশ্রদ্ধা করা কোনো ব্যক্তিকে অশ্রদ্ধা করা নয়, গোটা ডাকসুকে অশ্রদ্ধা, অপমান করার শামিল। প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম, আবদুল গফুর, আবদুল মতিনসহ যারাই ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা পালন করেছেন, পরবর্তীতে যে যেই দলই করুক না কেন, আমরা সকলকেই স্মারণ করি, শ্রদ্ধা জানাই। যারা আমাদের ভাষার এই অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে গেলেন, বেইনসাফ পাকিস্তান সরকারের হাত থেকে মুক্তির পথ দেখিয়ে গেলেন, আমরা সব সময় তাদের স্মরন করি, এটা আমাদের দায়িত্ব। আল্লাহ যেন তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দিন।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘স্বাধীনতার এই ৫০ বছরে জাতি অধিকার হারা জাতিতে পরিণত হয়েছে। এখন মানুষের কোনো অধিকারই নেই। থাকা, খাওয়া, বেচে থাকা, ইজ্জত রক্ষা, ভোট দেয়া, কথা বলা, ধর্মীয় স্বাধীনতা সবই এখন কেড়ে নেয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এদেশের আলেম-উলামা, মাদরাসা, মসজিদ, মক্তব, মারকাজগুলো যেন সরকারের প্রতিপক্ষ, সরকারের আচরণ থেকে এমনটিই মনে হয়। সরকারের কেউ কেউ নিজেদের তাহাজ্জুদগুজার বলে দাবি করেন। তাহাজ্জুদের সাথে এগুলো মানায় না।’

তিনি বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন স্থানে বই মেলা হয়। চট্টগ্রামের বই মেলায় ইসলামী প্রকাশনাগুলোকে অনুমতি দেয়া হয়নি। এমনকি স্টলগুলোতে ইসলামী বই যেন না রাখা হয়, সেই উদ্যোগ তারা নিয়েছে।’

জামায়াতের আমির বলেন, ‘আজকে মাদকের লাইসেন্স অবাধ করার পায়তারা করা হচ্ছে। ২১ বছরের বেশী বয়স হলেই অবাধে পানাহার করতে পারবে, এমন ব্যবস্থা করা হচেছ। যারা এধরনের নিদের্শনা জারি করেন, হয় তারা নিজেরা মাদকাসক্ত। তাই নিজেদের পানাহার অবাধ করার জন্য এই্ ব্যবস্থা করছে। না হলে তাদের সন্তান এদেশে থাকে না। তাই দেশের মানুষের সন্তানদের জন্য তাদের কোন মায়া নেই।’

তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা যা হারাম করেছেন, ৯৫ ভাগ মুসলমানের এই দেশে তা হালাল করতে পারে না।’

ঈমান রক্ষার তাগিদে এই অপকর্ম রুখে দাড়াতে তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘মুমিনরা আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পায় না। ভয় পাওয়া জায়েজও নেই। মনজিলে মকসুদে পৌছতে কারো সাথে আপোষ করারও সুযোগ নেই। আমাদের নেতৃবৃন্দ ফাসির রশিকে গ্রহন করে সবাইকে দাত ভাঙ্গা জবাব দিয়েছেন। যা গোটা মুসলিম উম্মার শির উচু করে দিয়েছে। আমরা তাদেরই উত্তরসুরি। যে আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ফাঁসির রশিকে চুম্বন করতে ভয় পায় না, তাদের উত্তরসুরীরা আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পায় না।’

কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুলের সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের পরিচালনায় আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ। বক্তব্য রাখেন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির মঞ্জুরুল ইসলাম ভূঁইয়া, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারী দেলোয়ার হোসেন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য আব্দুস সবুর ফকির, শামছুর রহমান, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য আব্দুস সালাম ও অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post জোটবদ্ধ হয়ে ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসলামী দলগুলো?
Next post চূড়ান্ত ১০ জনের নাম প্রকাশ করবে না সার্চ কমিটি