আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, তারপর নির্বাচন কমিশন

নূরুল হুদা কমিশনের অবসানের প্রাক্কালে একটা নতুন নির্বাচন কমিশন বসানোর ‘হাস্যকর সব তৎপরতা’ দেখে আমরা হাসব না কাঁদব ভেবেই পাচ্ছি না। ‘জ্ঞানপাপী’ শব্দটা অভিধানে কেন কবে কে বসিয়েছিল জানার হয়তো উপায় নেই, তবে সেটি ‘যথেষ্ট উপযোগী’ প্রমাণের একটা চমৎকার সুযোগ পাওয়া গেল! একটা সত্য ঘটনা উল্লেখ করি। গত বছর প্রয়াত বিশিষ্ট সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার ষাটের দশকে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে সেখানকার বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিক ‘ডন’, একই সঙ্গে দৈনিক ইত্তেফাকে (পশ্চিম পাকিস্তান সংবাদদাতা হিসেবে) রিপোর্টারের কাজ শুরু করেন। ডন-এ তিনি সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার হয়ে কাজ করেন অনেক দিন।

১৯৭৩ সালের শেষ দিকে দেশে ফিরে আসেন; পরবর্তী সাংবাদিকতা জীবনে তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের বিশেষ সংবাদদাতা, চিফ রিপোর্টার, আরও পরে নির্বাহী সম্পাদক এবং আরও পরে ইংরেজি দৈনিক ‘ডেইলি সান’ পত্রিকার সম্পাদক হন। তা ছাড়াও তিনি বিশ্বখ্যাত সাপ্তাহিক নিউজউইকসহ অনেক আন্তর্জাতিক দৈনিক ও সাময়িকীর সংবাদদাতা হিসেবে কাজের বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন, আর পেশাগত জীবনে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি এবং কমনওয়লেথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও পরে অ্যামেরিটাস সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

হাসান শাহরিয়ারের আর একটি বড় পরিচয় আছে- তিনি আসাম ও সিলেটের ব্রিটিশ-ঔপনিবেশিক আমলের একজন বিখ্যাত সাংবাদিক ও সম্পাদক এবং স্বাধীনতা-সংগ্রামী বিশিষ্ট রাজনীতিক মকবুল হোসেন চৌধুরীর সন্তান। তিনি জেল-জুলুম সহ্য করে গণমানুষের মুক্তির রাজনীতি করেছিলেন সুদীর্ঘকাল, পাঁচটি বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন ছাড়াও আসাম-সিলেট অঞ্চলের আইনসভার সদস্য হয়ে দায়িত্ব সম্পাদন করেছিলেন।

আমাদের এই শাহরিয়ার সাহেবকে একবার আশির দশকের শেষভাগে সুনামগঞ্জের এক জেলা প্রশাসক প্রস্তাব দিলেন- ‘বড়-ভাই, আপনার বাবা তো এমএলএ ছিলেন, আপনি কেন জাতীয় সংসদ সদস্য হচ্ছেন না? আপনি শুধু নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে দাঁড়িয়ে যান, বাকি কাজটা আমিই করে দেব। আপনাকে আর কিছুই করতে হবে না, নির্বাচনে পাস আমিই করিয়ে দেব।’ অনেকদিন ধরে হাসান শাহরিয়ারকে ওই ডিসি সাহেব বারবার অনুরোধ করে গেলেন। কিন্তু নীতি-নৈতিকতার বিষয়টি মাথায় রেখে হাসান শাহরিয়ার এভাবে অবৈধ পন্থায় নির্বাচনে জিততে রাজি হলেন না। শাহরিয়ার সাহেব অনেকবার তার সহকর্মীদের কাউকে কাউকে এ ঘটনা উল্লেখ করে বলতেন- দেখুন আমলারা চাইলে কী-না করতে পারে!

এই উদাহরণ কেন? এর মানে হচ্ছে- এ দেশে প্রায় চার দশক ধরে জেলার ডেপুটি কমিশনার, এমনকি উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা জাতীয় নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত ক্ষমতাধরের ভূমিকায়। এই ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর ভেতরে আরও যোগ হয়েছে জেলা পুলিশ সুপাররা। যোগ হয়েছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বিশাল প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা।

সত্য বটে, নির্বাচনের সময়কালে এসব মাঝারি আমলা বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অধীনে নিয়োজিত থেকে দায়িত্ব পালন করে থাকেন, তবে, সেটা নিতান্তই আনুষ্ঠানিকতা। আসল সত্য হচ্ছে, দলীয় সরকারের কর্তাব্যক্তিদের পরিচালনার মধ্যেই আমলারা কাজ করে যান, নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ থাকে নামকাওয়াস্তে। বাংলাদেশ আমলের পুরো সময়কালেই এই চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে কমবেশি। স্বৈরাচার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আমল থেকেই সব নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও সততার ক্রমশ অবসান ঘটছে এবং তা একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে বর্তমান আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে, বিশেষভাবে। কেবল কয়েকটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাদের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রমাণ মিলে।

মূল সংকটটা হচ্ছে: আওয়ামী লীগ নেতারা তো মানতেই নারাজ- তারা ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়ে কেন বিরোধী দলে যাবেন? তাদের মতে, তারা সর্বাধিক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছেন আর উন্নয়ন কাজে যেসব অপচয়-দুর্নীতি হচ্ছে তা-ও তো সব সরকারের আমলেই হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাহলে তাদের বিপক্ষে বিরোধী দলের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে নির্বাচনে হারাবে জনগণ, সে সুযোগ তারা কেন বিরোধী দলকে দেবেন?’

২০০৮ সাল থেকে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এই যে দীর্ঘকাল মহাতামাশা করে যাচ্ছে, তা সবাইকে মানতে বাধ্য করতে চায়। তাদের ভাষ্য- তারাই একমাত্র দেশ শাসনের, রাষ্ট্রক্ষমতা ভোগের যোগ্যতা রাখেন, আর কেউ নন।

পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তানি ভূস্বামী ও নব্য শিল্পপতি ২২ পরিবারকেন্দ্রিক পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠী জাতীয় নির্বাচনকে নিজেদের পক্ষে রাখার ও তাদের কায়েমি স্বার্থবাদীদের সরকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটা ক্ষমতাধর বলয় গড়ে তুলেছিল সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে। সেটা ছিল ভয়ংকর রাষ্ট্রীয় অনাচার। তবে ১৯৭০ সালের নির্বাচনটি পুরোপুরি সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ ছিল; আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লড়াকু বাঙালির সম্মিলিত শক্তিকে চূড়ান্ত পর্যায়ের মোকাবিলার মুখোমুখি দাঁড় করানোর কৌশল ছিল সেই নির্বাচন।

একেকটা মেয়াদ শেষে সরকার পরিচালনার সুযোগ লাভে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে প্রচলিত নির্বাচন ব্যবস্থার গণতান্ত্রিক পদ্ধতির বিপক্ষে সুকৌশলে বা কোথাও কোথাও একটু নগ্নভাবেই হয়তো দুর্নীতির আশ্রয়-প্রশ্রয় লাভের অপচেষ্টা চলে; তবে সুপ্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রের দেশ, যেমন- ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড- এসব রাষ্ট্রে বাংলাদেশের মতো ‘চরম ঔদ্ধত্যের’ নির্বাচনী দুর্নীতির কথা জানা যায় না। আর ভারত তো সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের রাষ্ট্র বিশ্বে, সেখানে তো সুদীর্ঘ সাত দশক পার হয়ে গেল, কিন্তু গণতন্ত্র সেখানে যথারীতি সুপ্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে, মারাত্মক কোনো ষড়যন্ত্র গণতন্ত্রকে ধসিয়ে দিতে পারেনি।

বাংলাদেশে অবস্থাটা ভিন্নতর। ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনটিকে ক্ষমতাধর আওয়ামী লীগ ‘অপ্রয়োজনীয়’ হওয়া সত্ত্বেও তা ধসিয়ে দিয়ে ৩০০ আসনের ২৯৩ আসন দখলে নিয়ে নিল। তারা সহজেই ২০০ বা কমবেশি পেয়ে যেত। কারণ, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং তাতে জয়লাভের ফলে ওই দলটির একটা বাড়তি ‘জনপ্রিয়তা-সুবিধা’ তো ছিলই। তাই আওয়ামী লীগের সামনে বিরোধী দলের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভের কোনো হুমকিই তো ছিল না। কিন্তু গণতন্ত্র কায়েমের লড়াই করা আওয়ামী লীগ ‘ভয়ংকর বুট জুতাটি’ পায়ে দিয়ে দাঁড়ানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত হলো। যা সর্বনাশ ডেকে আনল সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া ‘ভয়ানক যুদ্ধবিধ্বস্ত’ দেশটির জন্য।

এর পরের ইতিহাস আলোচনার আর প্রয়োজন নেই। এখন প্রমাণিত হয়ে গেছে- দলীয় সরকার সেটা আওয়ামী লীগ বা অন্য যে কোনো দলেরই হোক না কেন, তার অধীনে একটা সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়, তত্ত্বাবধায়ক ও নির্দলীয় সরকার থাকতেই হবে নির্বাচন পরিচালনাকালে। অন্তত শতভাগ মানুষ শিক্ষিত না হওয়া অবধি, সেই মাপের উদারতার সভ্যতা-সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা না পাওয়া অবধি, মানে কমপক্ষে আগামী চারটি জাতীয় নির্বাচন এই তত্ত্বাবধায়ক নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থাপনায় নির্বাচন পরিচালনা অপরিহার্য।

এখন এই যে সার্চ কমিটি দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠনের চেষ্টা হচ্ছে এর ফল কোনোভাবেই সদুদ্দেশ্যে পরিচালিত হবে না, হতে পারে না, অন্তত ১৩ বছরের অভিজ্ঞতা তাই বলে। এই কমিশন গঠন তখনি সফল হবে যখন এই নির্বাচন কমিশন একটা অন্তর্বর্তীকালীন, তত্ত্বাবধায়ক, নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে কাজের সুযোগ পাবে। সেই নিশ্চয়তা সবার আগে চাই। এখনকার এইসব কর্মকাণ্ড গণমানুষকে বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে, দেশবাসীকে তত্ত্বাবধায়ক ও নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারব্যবস্থার কথা ভুলিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এসব আয়োজন যা কোনো গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের কাছে আধা পয়সার গ্রহণযোগ্যতাও পেতে পারে না।

খায়রুল কবীর খোকন :বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব; সাবেক সংসদ সদস্য ও ডাকসু সাধারণ সম্পাদক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post মেজর (অব) আখতারুজ্জামানকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার
Next post সার্চ কমিটি নিয়ে বিএনপি-আওয়ামী লীগ মুখোমুখি