এখন কেমন আছেন খালেদা জিয়া?

টানা ৮১ দিন রাজধানী ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার পর গত ১ ফেব্রুয়ারি গুলশানের বাসা ফিরোজায় ফিরেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সেই থেকে বাসাতেই অবস্থান করছেন তিনি। ডাক্তারের রুটিন ফলোআপের মধ্যে দিয়ে কাটছে তার দিন। হাসপাতাল থেকে ফেরার ১৫ দিনের মাথায় তার শারিরিক অবস্থার খোঁজ নেয়া হয় ভয়েস অব আমেরিকার পক্ষ থেকে।

বিএনপির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘ম্যাডাম সুস্থ হননি। উনার যে রক্তক্ষরণ হতো, সেটা এখন আপাতত বন্ধ আছে। তবে চিকিৎসক বোর্ডের আশঙ্কা, যেকোনো সময়ে তার অবনতি হতে পারে। এরপরে আবারো যদি অবস্থার অবনতি হয়, তবে সেটি আরো খারাপ দিকে যেতে পারে। ম্যাডামের সর্বোত্তম চিকিৎসা এখানে দেয়া হলেও তার রোগের উন্নত চিকিৎসা এখানে নেই। এজন্য যুক্তরাজ্য অথবা যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার বিকল্প নেই।’

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় সাজা হলে কারাগারে যেতে হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়াকে। এরপরে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাতেও তার সাজা হয়। সেই থেকে ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরাতন কারাগারেই থাকতে হয় তাকে।

২০২০ সালে দেশে করোনাভাইরাস মহামারী শুরুর পর খালেদা জিয়ার পরিবারের আবেদনে প্রেক্ষাপটে তাকে গত বছরের ২৫ মার্চ নির্বাহী আদেশে সাময়িক মুক্তি দেয়া হয়। তবে মুক্তির শর্ত হিসেবে তাকে দেশেই থাকতে হয়। কারাগার থেকে বেরিয়ে খালেদা জিয়া ওঠেন গুলশানের ভাড়া বাসা ফিরোজায়। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে তিনি প্রায় দুই মাস হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এরপর আরো দুই দফা তাকে হাসপাতালে যেতে হয়েছিল।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। এরই ধরাবাহিকতায় সবশেষ গত বছরের ১৩ নভেম্বর ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরিক্ষার পর পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণ এবং লিভার সিরোসিসের কথা জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এরপরেই খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে দলের পক্ষ থেকে সারা দেশে কর্মসূচি পালন করে বিএনপি। পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে বিদেশে পাঠানোর জন্য কয়েক দফা আবেদন করেছিলেন তার ভাই। তবে ‘আইনে সুযোগ নেই’ উল্লেখ করে তা নাকচ করে দেয় সরকার।

বিএনপির চেয়ারপারসনের প্রেস উইয়েংর সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যার অবদান, তাকে সুচিকিৎসার জন্য সরকার সুযোগ দিচ্ছে না। এখন তিনি বাসাতে আছেন সত্যি, তবে ঝুঁকিমুক্ত নন।’

গুলশানের বাসায় গৃহকর্মী ও সবসময়ের সাহায্যকারী ফাতেমা তার দেখাশোনা করছেন। এছাড়া নিয়ম করে ডাক্তার গিয়ে দেখছেন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বড় বোন বেগম সেলিমা ইসলাম মাঝেমাঝে গিয়ে দেখা করছেন, সময় কাটিয়ে আসছেন। করোনার সতর্কতা হিসেবে বাইরের কেউ এই মুহূর্তে বাসায় যাওয়ার অনুমতি পাচ্ছেন না। এ জন্য দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরাও তার সাথে দেখা করতে পারছেন না। সবাই বলছেন, সতর্কতা হিসেবেই তারা এটি করছেন।

খালেদা জিয়ার বড় বোন বেগম সেলিমা ইসলাম জানান, ‘ওর শরীর আগের মতোই। এখানকার ডাক্তাররা যতটুকু সম্ভব তা করেছেন। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য বিদেশে চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এখন বাসায় আছে। আবার যদি অসুস্থতা বেড়ে যায় এখন সেটাই আশঙ্কা।’

পরিবারের পক্ষ থেকে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারের সাথে কোনো আলোচনা নতুন করে শুরু হয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নতুন করে কিছু বলা হয়নি। আগে তো চেষ্টা করা হয়েছিল। তখন অনুমতি পাওয়া যায়নি। তারা তো অনুমতি দিলো না।’

বাসায় সময় কাটে কী করে জানতে চাইলে সেলিমা ইসলাম বলেন, ‘নিয়ম করে ওষুধ খেতে হচ্ছে। খাবারের রুচি কমে আসলেও নিয়ম মেনে খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়। এর বাইরে খুব একটা কারো সাথে দেখা করতে চান না। প্রায় প্রতিদিনই সময় করে বিদেশে অবস্থানরত বড় ছেলে তারেক রহমানের সাথে কথা বলেন। কথা বলেন ছেলের বউ এবং নাতনিদের সঙ্গে।’

খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার যে দাবি ছিল সেটি আদায়ে কতোটা অগ্রসর হওয়া গেল, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নতুন বার্তা আছে কিনা এমন প্রশ্ন ছিল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘তার অবস্থা এখনো আগের মতোই আছে। হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে হঠাৎ করেই করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন থেকে সাবধানতার জন্য। চিকিৎসকরা ইতিমধ্যে বলেছেন, দেশে তার উন্নত চিকিৎসা সম্ভব নয়। এখানে যেটা হয়েছে সেটি প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসা। সুফল পেতে হলে যে ধরনের চিকিৎসা দেয়া দরকার তা এখানে নেই। তবুও সরকার অমানবিকভাবে তাকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দিচ্ছে না।’
সূত্র : ভয়েস অফ আমেরিকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post কর্নাটক হাইকোর্টে হিজাব ই্স্যুতে পিটিশনের শুনানি অব্যাহত
Next post নিত্যপণ্যের মূল্য স্বাভাবিক রাখতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে: বাণিজ্যমন্ত্রী