মার্কিন ‘কান্নায়’ ইউরোপকে সতর্ক হতে হবে

গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রাশিয়ার তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লা আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন। এটা এখন পর্যন্ত রাশিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দেওয়া সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। রাশিয়ার অর্থনীতির প্রধান ধমনি লক্ষ্য করে এবং পুতিনের ‘মাথা ব্যথা’ আরো বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য এই নিষেধাজ্ঞা। বাইডেন তাঁর ঘোষণায় বলেছেন, এই নিষেধাজ্ঞায় যুক্তরাষ্ট্রেরও ক্ষতি হবে।

তবে সাধারণ বিশ্বাস হলো, মূলত ইউরোপের লোকদেরই এই নিষেধাজ্ঞার যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে।

তথ্য-উপাত্ত তাই বলছে। ২০২১ সালে ইইউয়ের প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস আসে রাশিয়া থেকে এবং রাশিয়া ইউরোপের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহকারী দেশ। লন্ডনের আইসিই স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে ইউরোপে গ্যাসের পূর্বনির্ধারিত দাম (ফিউচার প্রাইস) ৫০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পায় এবং প্রতি এক হাজার ঘনমিটার গ্যাসের দাম তিন হাজার ৫০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের রুশ গ্যাস আমদানি করে না এবং তার তেল ও তেলজাতীয় পণ্যগুলোর মাত্র ৮ শতাংশ রাশিয়া থেকে আসে। এর পরও মার্কিন মিডিয়া ওয়াশিংটনের পক্ষে খেলছে এবং দাবি করে যে এই নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাবে। এটা একটা ‘টিয়ারজারকার’ (মায়াকান্না), যা ওয়াশিংটন ইউরোপের ওপর চালিয়ে দিয়েছে।

ইউক্রেন সংকটের অনেক আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি খুব গুরুতর একটি সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এমনকি ওয়াশিংটন মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা না দিলেও যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম বাড়াত। এটা প্রধানত মার্কিন অর্থনৈতিক কাঠামোর ব্যর্থতার ফল। কিন্তু ওয়াশিংটন এই সুযোগে নিজেকে শোকের ‘অগ্রদূত’ হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। সে ভণ্ডামিপূর্ণভাবে এই ভান করে যে ‘যদি আপনাদের অসুবিধা হয়, তাহলে আমি একা লড়াই চালিয়ে যাব। ’ প্রকৃতপক্ষে তার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো, তাকে অনুসরণ করতে ইউরোপীয় দেশগুলোকে প্ররোচিত করা এবং একযোগে রুশ জ্বালানি বয়কট করা।

বাস্তবতা হচ্ছে, ওয়াশিংটন নয়, ইউরোপকেই এর মূল্য দিতে হবে। জার্মানি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা কোনো নিষেধাজ্ঞায় যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে না। জার্মান চ্যান্সেলর ওলফ শোলজ বলে দিয়েছেন, ‘অন্য কোনো উপায়ে ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহ সুরক্ষিত করার সুযোগ নেই। ’ ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁও এক বিবৃতিতে স্পষ্টত বলেছেন, রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরশীল নয়, বরং ইউরোপ নির্ভরশীল।

ভূ-রাজনৈতিক কারণে রাশিয়াকে চেপে ধরার জন্য ‘নিষিধাজ্ঞা চক্রের’ আগুনে হাওয়া দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সত্য হচ্ছে, ট্রান্স-আটলান্টিক জোটের মধ্যে ঐক্য সুস্পষ্ট নয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এই ঐকমত্যে পৌঁছা অসম্ভব। অথচ ওয়াশিংটন অ-পশ্চিমা দেশগুলোকেও তার আদেশ অনুসরণ করার দাবি তুলেছে। এটি আরো ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও কর্তৃত্বপ্রয়াসী। যেমন—পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান প্রশ্ন করেছেন, ‘আমরা কি আপনাদের দাস?’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে পড়েছে ইউরোপ। এই সংকটের সমাধান এবং এর চূডান্ত সমাপ্তি মোকাবেলার প্রক্রিয়াটি সরাসরি ইউরোপের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত : মহাদেশটি কি সম্পূর্ণরূপে ওয়াশিংটনের কৌশলগত রায়ে পরিণত হবে? নাকি এটি বহুমুখী বিশ্বের একটি সম্মানজনক মেরুতে পরিণত হবে? এর ফলাফল নির্ভর করছে ইউরোপ কী করতে চায় তার ওপর। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপ কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের কথা প্রচার করছে, যে এজেন্ডা ইউক্রেন সংকটের কারণে গভীরভাবে বিপন্ন।

হাস্যকরভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করার ঠিক কয়েক দিন আগে ভেনিজুয়েলায় একটি উচ্চ পর্যায়ের মার্কিন প্রতিনিধিদল পাঠায়। লাতিন আমেরিকার দেশটির ওপর থেকে জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনার জন্য তারা সেখানে যায়। অথচ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিশানা ছিল ভেনিজুয়েলা এবং দুই দেশ ২০১৯ সালে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। এখন রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলাকে মুক্তি দিতে চায়। তার মানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগুলোর বিকল্পগুলো ফুরিয়ে যাচ্ছে।

এরই মধ্যে রাশিয়া ও ইউক্রেন আলোচনা করেছে এবং পরিস্থিতি সহজ করার বিক্ষিপ্ত কিছু লক্ষণ রয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটন সেই আশাব্যঞ্জক আলোটি দূরে সরিয়ে রাখতে আগ্রহী এবং সংকটকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার কোনো চেষ্টা বাদ দিচ্ছে না। ওয়াশিংটন ইউরোপকে তার বশে রাখা এবং তার পাশে বেঁধে রাখার চেষ্টা করছে, কারণ এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দরকারি অস্ত্র। ওয়াশিংটন যদি মস্কোকে ‘পরাজিত’ করতে চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই ইউরোপকে ব্যবহার ও কোরবানি দিতে হবে। সম্ভবত সব সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রয়োজন। কিন্তু ইউরোপের কি এর প্রয়োজন আছে?

রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট সাধারণ ইউরোপীয় জনগণের স্নায়ুকে উসকে দিয়েছে। ওয়াশিংটন স্পষ্টতই এই সংকটকে আরো তীব্র করার জন্য অনুভূতিটির সুযোগ নিচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে সর্বোচ্চ নিষেধাজ্ঞাও কখনো সমস্যার সমাধান করতে পারে না। এটি শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনীতি ও জনগণের জীবনযাত্রার জন্য গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করবে, এমনকি ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতাও সৃষ্টি করবে। ইউরোপ যেন তার চোখকে তীক্ষ করে তোলে।

উৎসঃ kalerkantho

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া
Next post রিজার্ভের ৩০০ বিলিয়ন ডলার ব্যবহার করতে পারছে না রাশিয়া