বাংলাদেশে মিসাইল রক্ষণাবেক্ষণাগার বানাচ্ছে চীন, উদ্বিগ্ন ভারত

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তাপ যখন বিশ্বময়, এই কঠিন সময়ে জাপানি সংবাদ মাধ্যমের চাঞ্চল্যকর একটি খবর নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে অন্তহীন কানাঘুষা। দু’দিন ধরে গণমাধ্যমে খবরটি ঘুরপাক খেলেও সেগুনবাগিচা এ নিয়ে এখনই আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দিতে নারাজ। টোকিওর প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘নিক্কেই এশিয়া’র ওই খবরে বলা হয়, বাংলাদেশে বিমান বিধ্বংসী মিসাইল (সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল) রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা প্রস্তুত করছে চীন। কিন্তু দেশের কোথায়, কবে থেকে চীনের মিসাইল মেনটেনেন্স ফ্যাসিলিটি সেট আপের উদ্যোগ? সে সম্পর্কে প্রতিবেদনে কোনো কিছু বলা হয়নি।

ঢাকা বা বেইজিং কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে মিসাইল রক্ষণাবেক্ষণাগার প্রতিষ্ঠার কথা স্বীকার না করলেও ‘নিক্কেই এশিয়া’র কন্ট্রিবিউটিং রাইটার নীতা লালের লেখা ওই প্রতিবেদনে এ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের বিষয়টি সবিস্তারে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনের দাবি- এ নিয়ে নয়াদিল্লি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। তাদের উদ্বেগের বড় জায়গা হচ্ছে- বাংলাদেশের মতো ভারতের পুরনো মিত্রদের সঙ্গে খাতির তথা প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করে চীন ওই সব দেশের সঙ্গে বিশেষ ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলছে। চীনের এই তৎপরতাকে ‘বাড়াবাড়ি’ হিসেবেই দেখছে ভারত।

নীতা লাল লিখেন- ২০১১ সালে বাংলাদেশকে যে সারফেস টু এয়ার মিসাইল দিয়েছে, তা রক্ষণাবেক্ষণে চীন এমন ব্যবস্থা তৈরি করছে যাকে ‘হাব’ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

আর এতেই নয়াদিল্লিতে অ্যালার্ম বেল বা বিপদ ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে। ‘রক্ষণাবেক্ষণ হাব’ প্রতিষ্ঠার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যেকার চুক্তি নিয়ে বেইজিং বা ঢাকা কেউই এখনো মুখ খুলেননি। অর্থাৎ এ বিষয়ে অদ্যাবধি আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে ঢাকার এক সিনিয়র কূটনীতিক নিক্কেই এশিয়াকে এটা নিশ্চিত করেছেন যে, এ নিয়ে দু’দেশের মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। অবশ্য এ সংক্রান্ত একটি ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টাও করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কূটনীতিক।

উল্লেখ্য, বিশেষভাবে ডিজাইন করা এবং ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী সারফেস টু এয়ার মিসাইল (স্যাম) যা গ্রাউন্ড টু এয়ার মিসাইল জিটিএএম বা সারফেস টু এয়ার গাইডেড উইপন (স্যাগউ) নামে পরিচিত। এই মিসাইলকে আধুনিক যুগের বিমান বিধ্বংসী ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করা হয়।

নিক্কেই এশিয়ার রিপোর্টের বিস্তারিত: নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদনে বাংলাদেশি কূটনীতিকের বরাতে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতিরক্ষা খাতের উন্নয়নের বিষয়টি বেইজিং এবং ঢাকা উভয়ে আড়ালে রাখতে চায়, কারণ চীন এখানে কি করছে তা পশ্চিমারা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে রেখেছে। তাছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র বিষয়ক যেকোনো চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর থেকে বেশ জটিল হয়ে গেছে। ওই আগ্রাসন বিশ্বকে এমনভাবে নাড়িয়েছে যে আজ সবাই যেকোনো মূল্যে যুদ্ধ থেকে বাঁচার জন্য আকুতি জানাচ্ছে।

রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশকে প্রদেয় সুবিধায় চীনা কোম্পানি ভ্যানগার্ড অংশীদার, এটি চীনের মিলিটারি রিলেটেড বিনিয়োগ এবং সরবরাহের অংশ। যার মধ্যে রয়েছে যুদ্ধজাহাজ, নৌ-বন্দুক, জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং সারফেস টু এয়ার মিসাইল সিস্টেম। সুইডেন-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান মতে, ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে চীনের সামরিক রপ্তানির ১৭ ভাগ গেছে বাংলাদেশে। যার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র গ্রাহকে পরিণত হয়েছে। অবশ্য বরাবরের মতো পাকিস্তান চীনের প্রধানতম অস্ত্র রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে রয়েছে। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, যদিও বাংলাদেশ নিজেকে ভারতের ‘ঘনিষ্ঠ মিত্র’ বলে মনে করে, তবে তারা চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

নিক্কেই এশিয়ার রিপোর্টে ওই কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়, তিনি বলেন, ‘২০০২ সালে দুইপক্ষ একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি সই করে, যার মধ্যে অস্ত্র উৎপাদনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এবং এটি উভয়ের মধ্যকার প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে, বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা প্রশিক্ষণের জন্য পিপলস লিবারেশন আর্মি ইনস্টিটিউটেও যাচ্ছেন।’

রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ তার নৌ-শক্তি বাড়াতে চীনের কাছ থেকে ২০৩ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে দুটি সাবমেরিন কিনেছে। চীনের সরবরাহকৃত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, বিশেষত ট্রেইনার এয়ারক্রাফট ও নৌ-ফ্রিগেট পরিচালনা সংক্রান্ত কারিগরি জটিলতা সত্ত্বেও এটি এসেছে। চীনের সরবরাহকৃত এফ-৯০ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তিগত ত্রুটি নিয়ে গত বছরও বাংলাদেশে বিতর্ক হয়েছে। এতদসত্ত্বেও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা ভবিষ্যদ্বাণী করছেন যে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান এবং ভিগোরাস মিলিটারি পার্টনারশিপ বাড়বে, যা ভারতের জন্য একটি বাড়তি চাপ! এ বিষয়ে নয়াদিল্লির জওহরলাল ইউনিভার্সিটির চায়নিজ স্টাডিজের প্রফেসর ড. শ্রীকান্ত কোন্দাপল্লির বলেন, ‘একটি মিসাইল ফ্যাসিলিটি স্থাপন এবং বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের অন্যান্য মিলিটারি এনগেজমেন্ট ভারতের বিরুদ্ধে চীনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ছাড়া আর কিছুই নয়।

এর মধ্যদিয়ে চীন ভারতকে ওই শক্তিশালী সংকেত পাঠাচ্ছে যে, দেশটি এখন চীনের কক্ষপথেই রয়েছে। তিনি আরও বলেন, এটি বাংলাদেশিদের সেন্টিমেন্টকে প্রভাবিত করবে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চীনপন্থি গোষ্ঠীগুলোর উত্থানের মতো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পুনর্গঠনের দিকে পরিচালিত করবে এবং দেশের অভ্যন্তরে চীনের ফুটপ্রিন্টকে শক্তিশালী করবে।

কোন্দাপল্লী বলেন, ঢাকা-বেইজিং বন্ধুত্ব ভারতের জন্য কোনো অস্তিত্বের হুমকি সৃষ্টি করে না। আমরা (ভারত) তাদের দুই দেশের মধ্যকার সামরিক অংশীদারিত্বে আপত্তিও করতে পারি না, কারণ তারা সার্বভৌম রাষ্ট্র। তবে এতে চীনের একটি নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকা উচিত।’ বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার অতীত সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না উল্লেখ করে ওই স্কলার বলেন, বেইজিং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টির সমালোচনায় মুখর ছিল। এমনকি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্তি ঠেকাতে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হিসেবে তারা তাদের প্রথম ভেটো পাওয়ার প্রয়োগ করেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ১৯৭৪ সালে উভয়ের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং একে অন্যের কাছাকাছি আসতে শুরু করে।

সেই সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ-এ যোগ দেয় বাংলাদেশ। রিপোর্ট মতে, কিছু বিশ্লেষক বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতাকে শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে দুর্বল করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখেন। এ প্রসঙ্গে কাজাকিস্তান, সুইডেন ও লাটভিয়ায় ভারতের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকারী কূটনীতিক অশোক সাজ্জানহার বলেন, ‘এ কারণেই তারা (বেইজিং) নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল এবং ২০২১ সালে বাংলাদেশকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়াডে যোগদান থেকে বিরত থাকতে (আগাম) হুমকি দিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপান চতুর্দেশীয় ওই ব্লক বা কোয়াডের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ বা কোয়াডের কোনো সদস্য- কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে (অন-রেকর্ড) স্বীকার করেনি যে, তারা ঢাকাকে কোয়াডের নতুন সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

ওই কূটনীতিক বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে নয়াদিল্লি যথাযথভাবে ঢাকায় তার নিজের অবস্থান জোরদার করছে। তার মতে, বাংলাদেশকে প্রতিরক্ষা সামগ্রী আমদানির জন্য ভারত ৫০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা দিয়েছে। সেই ঋণের অর্থে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ১৮টি ১২০ মি.মি মর্টার পায়, যা ছিল ঢাকা-দিল্লির প্রতিরক্ষা খাতে পারস্পরিক সহযোগিতার অংশ।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা: দক্ষিণ এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাদের (চীন) চেকবুক ডিপ্লোমেসি এবং অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিপরীতে ভারতকে অবশ্যই সতর্কতার সঙ্গে পথ চলতে হবে। এ বিষয়ে দিল্লির প্রাক্তন বিদেশ সচিব কানওয়াল সিবাল বলেন, চীনের আগ্রাসন এবং ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা দক্ষিণ এশিয়াকে শক্তি প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এ অবস্থায় চীনকে ভারতের কৌশলগত আঙ্গিনা থেকে দূরে রাখতে ভারতকে অবশ্যই ত্রিমুখী কৌশলে লড়তে হবে। কৌশল ৩টি হচ্ছে- এক. উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য অভ্যন্তরীণ নীতিগুলোকে সমুন্নত রাখা। দুই. সব প্রতিবেশীর সঙ্গে সক্রিয়তা এবং সদ্ভাব বজায় রেখে চলা এবং (তিন.) প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা।

তবে এ বিষয়ে নয়াদিল্লির জওহরলাল ইউনিভার্সিটির চায়নিজ স্টাডিজের প্রফেসর ড. শ্রীকান্ত কোন্দাপল্লির মত হচ্ছে- বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে অবশ্যই পাল্টা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে দিল্লিকে। এশীয় অন্যান্য দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা ভারতের ডেভেলপ করা ক্ষেপণাস্ত্র যেভাবে ফিলিপাইনে পাঠাচ্ছি; একইভাবে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনামের মতো অন্যান্য চীন-বিরোধী দেশগুলোতে তা পাঠাতে পারি। এ ছাড়া ঢাকার সঙ্গে আমরা এমন এক সমীকরণ পুনঃস্থাপন করতে পারি, যাতে চীনের নাম উল্লেখ না করে এ সংক্রান্ত যৌথ বিবৃতি দেয়া হবে; যেখানে জোর দিতে বলা হবে দিল্লি বা ঢাকা কেউই এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে এমন কোনো কিছুতে আমরা (উভয়ে) সম্পৃক্ত হবো না।’

উৎসঃ মানবজমিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post ড. কামালের হাতেই গণফোরাম
Next post ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া নিয়ে ভারতের ব্যাখ্যায় যা বলল পাকিস্তান