জাতীয় সরকারে থাকছে আওয়ামীলীগও!

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ‘সরকারব্যবস্থা’ নিয়ে বিরোধী জোটে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। বিএনপিসহ কয়েকটি দল নির্বাচনকালীন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের দাবি জানালেও তাদের সঙ্গে একমত নন জোটের একাধিক শরিক।

আ স ম আবদুর রবের জেএসডি ও কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদের এলডিপিসহ কয়েকটি দল জাতীয় সরকারের পক্ষে। এ দুই ফর্মুলা নিয়েই জোটের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। এটা নিরসনে বিকল্প হিসাবে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের’ প্রস্তাব নিয়েও কাজ করছেন বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের গুরুত্বপূর্ণ তিন নেতা।

নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে ঐকমত্যে পৌঁছাতে ইতোমধ্যে দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন তারা। একাধিক ফর্মুলা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। ফর্মুলা চূড়ান্ত হওয়ার পর রূপরেখা নিয়ে কাজ শুরু হবে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।

নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ ও জাতীয় সরকার-এ দুই ‘ফমুর্লার’ পক্ষে যুক্তি তুলে ধরছে দলগুলো। বিএনপি বলছে, নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেই তা অবাধ ও সুষ্ঠু হবে, জনগণ নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।

আর জাতীয় সরকারের পক্ষে দলগুলোর যুক্তি হচ্ছে-দীর্ঘদিন যারা ক্ষমতায়, তারা পুরো প্রশাসন নিজেদের মতো করে সাজিয়ে রেখেছেন। মাত্র তিন মাসে নির্দলীয় ব্যক্তিদের পক্ষে এই প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো সম্ভব না। তাই অন্তত দুই বছর জাতীয় সরকার ক্ষমতায় থাকতে হবে।

এরপর তাদের অধীনে আগামী নির্বাচন হবে। ঐক্যফ্রন্টের শরিক নাগরিক ঐক্য জাতীয় সরকার এবং নির্দলীয় সরকারের বিষয়ে আপত্তি তুলছে। তাদের দাবি, কোনো ব্যক্তিই নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় নন, সুতরাং এ দাবি অযৌক্তিক।

আর জাতীয় সরকার বলতে যদি সেখানে আওয়ামী লীগেরও প্রতিনিধি থাকে, তা জনগণ কখনো গ্রহণ করবে না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে-যাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলছে, তাদের প্রতিনিধি জাতীয় সরকারে থাকলে বিরোধী দলগুলো জনগণের কাছে কী জবাব দেবে?

সূত্র জানায়, এ দুই ফর্মুলার বাইরে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের’ প্রস্তাব করেছে ঐক্যফ্রন্টে থাকা একটি দল। প্রস্তাবটি নিয়ে বিএনপি নেতারা গত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনাও করেছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নানা দিক নিয়ে পর্যালোচনাও হয়।

নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে একটি ‘ফর্মুলায়’ ঐকমত্যে পৌঁছাতে ইতোমধ্যে বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না দলগুলোর সঙ্গে কথা বলছেন। এর সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছেন গণফোরামের ড. কামাল হোসেনও।

তিনিও এ নিয়ে কয়েকটি দলের সঙ্গে কথা বলেছেন। নেতারা আশা করছেন, সব দলের সঙ্গে আলোচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা বের করা সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, আমাদের দলের দাবি-কোনো দলীয় সরকার নয়, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন হতে হবে।

কেউ যদি জাতীয় সরকারের কথা বলে থাকে, এটা তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বলেছেন। প্রতিটি দলেরই বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়ার স্বাধীনতা রয়েছে। এ নিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব বা সমস্যা হবে না। যে যার জায়গা থেকে সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি আমরা। আলোচনার মাধ্যেমে সব ইস্যুতে ঐকমত্য হবে বলে আশা করছি।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম দল গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে চাই। সেটা করতে হলে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকার বা জাতীয় সরকার-কোনটা হবে, সেটা আলোচনার বিষয়।

যেটার ওপর ঐকমত্যে আসা যায়, সেটার পক্ষে আমি। আমরা কোনো দাবি জানিয়ে বিভেদ সৃষ্টি করতে চাই না। আমরা চাই-বৃহত্তর ঐক্য তৈরি হোক। সবাইকে নিয়ে বসব, দেখি কীভাবে ঐকমত্যে আনা যায়।

গণঅধিকার পরিষদের আহ্বায়ক ড. রেজা কিবরিয়া যুগান্তরকে বলেন, আমরা নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মুলার সঙ্গে একমত। জাতীয় সরকারের বিষয়টি তো পরিষ্কার নয়। এটিতে কি আওয়ামী লীগও থাকবে?

আওয়ামী লীগ ছাড়া যদি জাতীয় সরকার হয়, তাহলে আমাদের কাছে তা গ্রহণযোগ্য। আর যদি এ দুই ফর্মুলা গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে জাতিসংঘের অধীনে নির্বাচনের দাবি আমাদের।

তিনি বলেন, নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার তো পরীক্ষিত, সেটার দিকে যাওয়াই ভালো। বাকি ফর্মুলা তো পরীক্ষিত নয়। আমি মনে করি, এ নিয়ে মতবিরোধ খুব বেশি নয়। কারণ যারা জাতীয় সরকারের কথা বলছেন, তারা অবশ্যই নিরপেক্ষ সরকারও মানবে।

বরং তর্কবিতর্ক হতে পারে সময় নিয়ে। এটা ওয়ান-ইলেভেনের মতো হবে নাকি তিন মাসের মতো হবে। সেটা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

বিএনপির সঙ্গে ভিন্নমত পোষণকারী ঐক্যফ্রন্টের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব যুগান্তরকে বলেন, মূল দাবিটা হলো এই সরকারের পরিবর্তন। দেশে সরকার পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেদিকে যাবে, তা ঠেকানের জন্য একক দলের পক্ষে সম্ভব হবে না।

শ্রমজীবী, পেশাজীবী, সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নিয়ে যথাসম্ভব জাতীয় সরকার গঠন করতে হবে। কারণ জনগণ বারবার ধোঁকা খেয়েছে। জনগণ দলীয় সরকারের পরিবর্তে আরেকটি দলীয় সরকার চায় না। তারা তাদের অংশগ্রহণ ও অধিকার চায়। অতএব সেটা করার জন্য জাতীয় সরকার ছাড়া বিকল্প নেই।

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বলেন, বিএনপির দাবির সঙ্গে আমাদের দাবির কোনো পার্থক্য নেই। দুটিই একই ধরনের দাবি; কিন্তু শব্দচয়নগুলো আলাদা।

আমাদের বক্তব্য হচ্ছে-বিগত ১৩-১৪ বছরে নির্বাচন কমিশনসহ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করা হয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলো বিরাজনীতিকরণ ছাড়া নির্বাচনে গেলে কোনো লাভ হবে না।

বিগত দিনে যেভাবে রাতে ভোট লুট হয়েছে, তাদের কারণে একই ধরনের সমস্যা হবে। আমরা চাই-জনগণ যেন সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনে ভোট দিতে পারে। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়। সবার ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়। ক্ষমতায় যাওটা প্রধান লক্ষ্য হতে পারে না, জনগণের সরকার গঠন করাই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

জাতীয় সরকারে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিও থাকবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যথাসময়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীও জাতীয় সরকারের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, জাতীয় সরকার হলে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নয়।

বিএনপির প্রতিনিধি থাকলে আওয়ামী লীগেরও প্রতিনিধি থাকবে। এতে হবে কী, আওয়ামী লীগ ভয় পাবে না। তা না হলে আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে বলেছে কয়েক লাখ লোক মারা যাবে।

এসব ভয়ের অবসান এবং সুশাসনের জন্য জাতীয় সরকারে সবার প্রতিনিধি রাখার কথা আমি বলেছি। দুই বছরের জন্য জাতীয় সরকার বা সর্বদলীয় সরকার হলে দেশের পরিবর্তন হবে, সুশাসন ফিরে আসবে।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এটা কোনো বিরোধের বিষয় নয়। বিএনপি নিজেই এ নিয়ে দিধাদ্বন্দ্বে। তারা বলছে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকার, মানে নির্দলীয় কেয়ারটেকার সরকার।

কোনো দলের নয় বলছে, আবার নিরপেক্ষও বলছে। এই যে ১৩ বছর ধরে দুঃশাসন চলছে, দুর্নীতি-লুটপাট চলছে-এগুলোর বিচার হবে না? পুরো প্রশাসন যে নিজের মতো করে সাজিয়ে ফেলছে, এই প্রশাসন রেখে তো ভোট করে জেতা যাবে না।

প্রশাসন তো সাজাতে হবে। এজন্য আমি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে। সে সরকার নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করতে কাজ করবে। এর জন্য প্রশাসন ঠিক করতে হবে, দোষীদের সাজা দিতে হবে।

তিনি বলেন, তবে বাস্তবতা হলো-আন্দোলনের মাধ্যমেই যদি সরকারকে ফেলে দেওয়া যায়, তাহলে আন্দোলনের শক্তি দিয়েই সরকার হবে। আমরা যদি অতদূর যেতে না পারি, মাঝখানে যদি কেউ আসে, তাহলে তারা তাদের মতো সরকার করবে।

তখন যে সরকার করবে, মানুষ তার পক্ষে থাকবে। যারা জাতীয় সরকারের কথা বলছেন, তাদের মতলবটা ভালো মনে হয় না। এ ফর্মুলায় আওয়ামী লীগ তো থাকতে পারে না, এটা তো হয় না।

সূত্র জানায়, জাতীয় সরকারের পক্ষে সমমনা গণফোরাম (মন্টু), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন প্রভৃতি দলও রয়েছে। তবে হঠাৎ করে জাতীয় সরকারের দাবিতে যেসব দল সরব, তাদের সন্দেহের চোখে দেখছে বিএনপি।

দলটির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, জাতীয় সরকারের পক্ষে যারা কথা বলছেন, তারা নিজেদের স্বার্থেই কথা বলছেন। সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ক্ষমতায় এলে তারা আশানুরূপ মূল্যায়ন না পাওয়ার আশঙ্কা থেকে জাতীয় সরকারের দাবিতে একাট্টা হতে পারেন।

তাদের পেছনে একটি তৃতীয় গোষ্ঠীও রয়েছে বলে ধারণা করছেন। যাদের সঙ্গে সরকারেরও সম্পর্ক রয়েছে। নেতারা আরও বলেন, অনির্বাচিত জাতীয় সরকারের অধীনে দুই বছর রাষ্ট্র চলতে পারে না।

এক্ষেত্রে বিএনপি তাদের সঙ্গে আলোচনা করছে। আলোচনার মাধ্যমে জুনে মধ্যেই ‘নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকার’ কিংবা ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের’ একটি রূপরেখা দিতে চান তারা। যেখানে দাবির পক্ষে যুক্তিসহ বিস্তারিত থাকবে। এ নিয়ে নীতিনির্ধারকরা কাজ করছেন।

উৎসঃ jugantor

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post দুই ‘ফর্মুলা’য় বিএনপিসহ বিরোধী জোটে মতানৈক্য
Next post শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক যুদ্ধেই জড়াতে যাচ্ছে পুতিন?