মুরগি বাবরের উত্থান-পতন

ফরিদপুর এলাকায় তিনি মুরগি বাবর নামেই পরিচিত। এক সময় মুরগির ব্যবসা করতেন। মুরগি পালন এবং ডিম বিক্রি করেই তার সংসার চলতো। সেই তিনি ফুলে ফেঁপে উঠলেন।

২ হাজার কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক। তার বাড়ি আছে কানাডায় এবং তার কত সম্পদ আছে, তা নিজেও হয়তো তিনি জানেন না। তিনি হলেন, খন্দকার মোহতেশাম বাবর।

তার আসল পরিচয় হলো তিনি সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ফরিদপুর-৩ আসনের এমপি ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছোট ভাই। ভাইয়ের ক্ষমতা দিয়ে তিনি ক্ষমতাবান হয়েছিলেন এবং বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন। অথচ এই বাবর এক সময় বিএনপির রাজনীতি করতেন।

তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্ট পর্যন্ত ছিলেন। সেই তিনি ২০০৯ এ হয়ে যান আওয়ামী লীগের হর্তাকর্তা এবং ভাই খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছায়া।

তারপর তার উত্থান ঘটে অলৌকিক গতিতে। তিনি যেন ফরিদপুরের অঘোষিত সম্রাটে পরিণত হন। তার কথায় ফরিদপুরের সবকিছু হতো। গতকাল বাবরকে গ্রেপ্তারের পর ফরিদপুরবাসীর মুখে জানা যায় তার চাঞ্চল্যকর বিভিন্ন তথ্য।

মুরগি বাবর ২০০৯ এর পর থেকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পাসপোর্ট অফিস, সড়ক বিভাগ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, শিক্ষা অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ বিভাগসহ বিভিন্ন সরকারি কাজের তদারকি করতেন এবং তার নির্দেশ ছাড়া কেউ কোনো কাজ পেত না। আর এ সমস্ত কাজের বিনিময়ে তাকে শতকরা ১৫ শতাংশ দিতে হতো।

এজন্য তার নাম হয়েছিল মিষ্টার ফিফটিন পার্সেন্ট। আর কোনো কাজ করতে গেলে এই টাকা যদি তাকে না দেওয়া হতো তাহলে সেই কাজ বন্ধ করে দেওয়া হতো।

ফরিদপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য শামসুল হক ওরফে ভোলা মাস্টার বাংলা ইনসাইডারকে বলেছেন, খন্দকার মোশাররফ টাকা-পয়সা কামাই এর জন্য ভাইকে দলে টেনে আনেন।

খন্দকার মোহতেশাম যেহেতু বিএনপি’র রাজনীতি করতেন, সেহেতু ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রভাব-প্রতিপত্তির ক্ষেত্রে বিএনপির লোকদেরই প্রাধান্য দিয়েছেন। তাদের সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। বিনিময়ে নিজে সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন।

পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ, ত্যাগী, পরীক্ষিতদের নিশ্চিহ্ন করার এক মিশনে নেমেছিলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি ও বীর মুক্তিযুদ্ধা নূর মোহাম্মদ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা শওকত আলী জাহিদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মনির হোসেন এর ওপর খন্দকার মোহতেশামের নির্দেশে হামলার অভিযোগ রয়েছে।

এই বিষয়ে একটি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে বলেও জানা যায়। বাবর ফরিদপুর আওয়ামী লীগের যারা দীর্ঘদিনের ত্যাগী এবং বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, তাদের নিধনের একটা অভিযান করেছিলেন। ২০২০ সালের ১৬ মে ফরিদপুর আওয়ামী লীগের সভাপতি সুবল চন্দ্র সাহার বাড়িতে হামলা করা হয়।

এই হামলার ঘটনায় সুবল চন্দ্র সাহা দুই দিন পর মামলা করেন। এই মামলার সূত্র ধরে ২০২০ এর ৭ জুন পুলিশ প্রথমে অভিযান পরিচালনা করে খন্দকার মোশাররফের দুই শিষ্য বরকত এবং রুবেলকে গ্রেপ্তার করে। এরপরই আস্তে আস্তে ফরিদপুরের অন্ধকার জগতের খবর বেরিয়ে আসতে থাকে এবং তখন দেখা যায় যে, এসবের নাটের গুরু ছিল বাবর। মুরগির ব্যবসা থেকে যিনি রাতারাতি হয়েছিলেন হাজার কোটি টাকার মালিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post রাশিয়া ইস্যুতে পশ্চিমারা নাখোশ বাংলাদেশের ওপর?
Next post সোমবার সারাদেশে হরতাল