ইসলামোফোবিয়ার আদ্যোপান্ত: কী এবং কেন? কী-ই বা করার আছে আমাদের?

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রবাসীদের সাথে সাথে সারা বিশ্ব অবাক বিস্ময় আর অবিশ্বাস্য এক ক্রোধ নিয়ে তাকিয়ে ছিল টুইন টাওয়ার ধ্বংসের দৃশ্যের দিকে।

সেই অবর্ণনীয় আর নির্দয় আক্রমণে নিহত হন ২৯৯৬ জন নিরীহ মানুষ। আহত হয় আরো প্রায় ৬ হাজার। ধ্বংস হয় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমানের সম্পদ। খবর উন্মোচিত হতে হতে সারা বিশ্ব ক্রমান্বয়ে জানতে পারলো এ ঘটনার সাথে জড়িত একটি ধর্মের নাম। বেশ ক’বছর ধরে চলতে থাকা একটি শব্দ ‘ইসলামোফোবিয়া’ আবার নতুন করে প্রাণ পেলো। আর সেই সাথে বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশে, বসবাসরত মুসলিমরা উপহার পেতে শুরু করল একরাশ ঘৃণা, যে ঘৃণা পাবার মতো কোনো কাজই তারা করেনি।

একটি ধর্মকে ঢাল বানিয়ে আর অপব্যাখ্যা দিয়ে প্রাণের পর প্রাণ কেড়ে নিয়ে সন্ত্রাসীরা সাধারণ মুসলিমদের ‘মুসলিম’ পরিচয়কে অমুসলিমদের কাছে একটি ভয়ংকর ভয়ের বস্তু হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিল। ১৪০০ বছর আগে পরলোকগমন করা সেই ইসলাম ধর্মের মহান নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে তিনি এই ‘মুসলিম’ নামধারী ত্রাস সৃষ্টিকারীদের ব্যাপারে কী বলতেন? তাঁরই নাম ভাঙিয়ে তারা এ কাজগুলো করছে, কিন্তু আসলেই কি সে কাজগুলো এরকমভাবে অনুকরণীয় হবার কথা? এই ইসলামভীতির কারণ, ফলাফল আর কিছু অপব্যাখ্যার প্রকৃত ব্যাখ্যা- এগুলোর আদ্যপান্ত নিয়েই কথা হবে আজকের লেখায়।

যেদিন আমি টিভিতে খবরে দেখছিলাম টুইন টাওয়ার থেকে লকলকে আগুনের শিখা আর ধোঁয়া বের হচ্ছে, আর কিছুক্ষণ বাদে পুরো বিল্ডিংদুটো ভেঙে পড়ল, সেদিন আমি ছিলাম আমার খালার বাসায়। আমার ছোট এক কাজিনের সেদিন জন্মদিন ছিল। জন্মদিনের কেক কাটার জন্য ছুরি ওঠানো হয়েছে, তখনই পেছনে টিভিতে ব্রেকিং নিউজ দেখতে পেলাম। আমার বয়স তখন সবে মাত্র নয়, অবশ্যই এত কিছু বোঝার ক্ষমতা আমার ছিল না, বুঝিওনি। তবে এটুকু বুঝতে পেরেছিলাম যে খুব খারাপ একটা কাজ হয়েছে; আর অনেকগুলো মানুষ মারা যাচ্ছে। কেন? কেন মারলো এভাবে? কার কী লাভ হলো?

বড় হতে হতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশোধের খেলা দেখলাম। দেখলাম কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যের এক একটা দেশ আমেরিকার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ইরাক, আফগানিস্তানে তাণ্ডবলীলা দেখলাম। আবার উল্টো রকমের কাহিনীও শুনলাম, এগুলো আসলে ইহুদি-নাসারাদের চক্রান্ত। একটা সময় ‘আল-কায়েদা’ নামের সংস্থাই ছিল সব, যে নাম শুনলে আমাদের মানসপটে ভেসে উঠত আক্রমণাত্মক এক ইসলাম ধর্মের কথা। এরপর এলো অন্যান্য সংগঠন- বোকো হারাম, আইসিস (ISIS) বা আইএসআইএল (ISIL), এখন সংক্ষেপে কেবল আইএস (IS) ইত্যাদি। “শান্তির ধর্ম ইসলাম”-এ বাণীটা ধীরে ধীরে সুদূর অতীত অনুভূত হতে লাগলো। কিন্তু এই ইসলামোফোবিয়া কি আগে ছিল না? নাকি ৯/১১ থেকেই এর শুরু?

Islamophobia শব্দটার সূত্রপাত ‘৭০ এর দশকেই হয়, কিন্তু জনপ্রিয় হতে থাকে ‘৯০ এর দিকে এসে। ১৯৮৯ সালে সালমান রুশদি’র ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ বইতে হযরত মুহাম্মাদ (সা)-কে অপমান করা হয়, যার ফলশ্রুতিতে ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি রুশদির মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে ফতোয়া দেন। বিশ্ব তখন প্রথমবারের মতো দেখলো কীভাবে কোনো ফৌজদারি অপরাধ কিংবা খুনখারাবি না করেও কেউ মৃত্যুহুমকি পেতে পারে এবং সে হুমকি আসে ধর্ম থেকেই। এর আগে এর সাথে পশ্চিমা বিশ্ব পরিচিত ছিল না। এর মাধ্যমে মূলত ‘ব্লাসফেমি’ আইন ব্যাপারটা দৃশ্যপটে আসে, যেটা ইসলামি দেশগুলোতে প্রচলিত আছে।

মধ্যযুগে ইউরোপের মানুষ ঠিকমতো জানত না যে ইসলাম কী। ইউরোপের খ্রিস্টানগণ যেহেতু খ্রিস্ট ধর্মপ্রচারক যীশু খ্রিস্টকেই উপাসনা করত, তাই তারা ধরে নিয়েছিল মুসলিমরাও নিশ্চয়ই হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর উপাসনা করত। অনেকেই, বিশেষ করে ড্যান ব্রাউনের বই যারা পড়েছেন তারা ‘ইনফার্নো’-র কথা শুনে থাকবেন, বা হয়ত মূল কবিতার বইটি পড়ে থাকবেন। সেখানে কবি দান্তে (Dante) এই চরম ইসলামবিদ্বেষ বা ভীতি থেকে তার ‘ডিভাইন কমেডি’ বইতে হযরত মুহাম্মাদ (স) আর হযরত আলী (রা)-কে ইনফার্নো বা দোযখের অষ্টম স্তরে দেখিয়েছিলেন! তাছাড়া তৎকালীন খ্রিস্টধর্মের অনুসারীদের কাছে হযরত মুহাম্মাদ (সা)-কে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল ‘Anti-Christ’ নামে। অথচ তারা জানতো না, ইসলাম ধর্মেও হযরত ঈসা (আ) বা যীশুকে ‘মাসীহ’ বা খ্রিস্ট হিসেবে সম্মান করা হয়, যদিও ঈশ্বর হিসেবে না। তারা মুহাম্মাদ (সা) এর নামের কিছু বিকৃত রূপ ব্যবহার করত, যেমন Mahound; এ নামটিই ব্যবহার করে সালমান রুশদি তার স্যাটানিক ভার্সেস বইতে মুসলিমদের ক্রোধের কারণে পরিণত হন। মধ্যযুগীয় ইসলাম নিয়ে অজ্ঞতা থেকেই মূলত তখন ইসলামভীতি/ইসলামোফোবিয়া জন্মেছিল।

তবে ১৯৮৯ সালের ঘটনার পর থেকে মানুষ ইসলাম ধর্মকে ভয় পেতে থাকে। এ ধর্মকে বর্বর আর মৃত্যু-আনয়নকারী হিসেবে জানতে থাকে। ‘ইসলামোফোবিয়া’ শব্দের অর্থই তাই, ইসলামে প্রতি ভীতি, ইসলাম নামের আদর্শকে ভয় পাওয়া, ইসলাম ধর্ম পালনকারীদের কাছ থেকে ক্ষতির আশংকা করা।

কিন্তু কীভাবে এই ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডগুলো কুরআনের আয়াত দিয়ে বৈধতা দিয়ে দিচ্ছে এই ধর্মকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো? কীভাবে মানবহত্যা বৈধতা পাচ্ছে ধর্মের নামে? চলুন দেখি, আসলেই ইসলামে কী বলা হয়েছে।

ইসলাম যে বর্বর ধর্ম সেটা প্রমাণ করার জন্য কুরআনের যে আয়াতটি সবচেয়ে বেশিবার ব্যবহার করে থাকে বিরোধীরা সেটা হলো সুরা তৌবার ৫ নং আয়াত। এটাকে ‘সোর্ড ভার্স’ (Sword Verse) বা ‘তরবারির আয়াত’ নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। এ আয়াত ব্যবহার করেই আবার উল্লেখিত সংঘটনগুলো মানবহত্যা বৈধ করে থাকে। আয়াতে বলা হচ্ছে, “… পৌত্তলিকদের হত্যা করো যেখানে তাদের পাও, তাদের বন্দী কর এবং অবরোধ কর। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাক…” [কুরআন ৯:৫]

কিন্তু তারা যে জিনিসটা উপেক্ষা করে যায় সেটি হলো এর আগের আর পরের কথাগুলো, এই আয়াতেই পুরো কথাটা হচ্ছে, “অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে পৌত্তলিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও, তাদের বন্দী কর এবং অবরোধ কর। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাক। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [৯:৫]

এর প্রথম অংশ থেকে আমরা দেখতে পাই, ‘অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে’। অর্থাৎ এ আয়াতে বলা হচ্ছিল একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করবার কথা। তার মানে এটা কেবল একটা নির্দিষ্ট ঘটনার কথা বলছে, যেকোনো জায়গায় ব্যবহারের জন্য নয়। কী সেই ঘটনা? আমরা ফিরে যাই একদম প্রথম আয়াতে- “সম্পর্কচ্ছেদ করা হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে সেই পৌত্তলিকদের সাথে, যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে।” [৯:১]

বোঝা গেলো যে, একটা চুক্তি হয়েছিল পৌত্তলিকদের সাথে মুসলিমদের। পৌত্তলিক বলতে মক্কার মূর্তিপূজকদের কথা বলা হচ্ছে, যাদের কারণে নবী (সা) জন্মভূমি মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় গিয়ে বসবাস করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

৯:২ আয়াত যদি আমরা দেখি, সেখানে বলা হচ্ছে ‘চার মাসের একটা সময়কালের’ কথা। এটা নিষিদ্ধ সময়, এ সময়ে কোনো আক্রমণ করা যাবে না, যদিও পৌত্তলিকেরা চুক্তিভঙ্গ করেছে। চতুর্থ আয়াতে বলা হয়েছে, “তবে যে পৌত্তলিকদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ, যারা তোমাদের ব্যাপারে কোনো ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করেনি, তাদের সাথে কৃত চুক্তিকে তাদের দেয়া মেয়াদ পর্যন্ত পূরণ কর। অবশ্যই আল্লাহ সাবধানীদের পছন্দ করেন।” (৯:৪) অর্থাৎ যারা কথা রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধে কিছু করার প্রশ্নই আসে না। তারা পৌত্তলিক বা অমুসলিম বলেই যে মেরে ফেলতে হবে তা নয়। এরপরেই আসে সেই বিখ্যাত ৯:৫ আয়াত, যেখানে হত্যার কথা বলা হয়েছে, তবে কেবল চুক্তি ভঙ্গকারী সেই পৌত্তলিকদের এবং অন্য কাউকে নয়। তবে তারা ক্ষমা চাইলে বা ইসলাম গ্রহণ করলে তারা মুক্ত।

তথাকথিত ‘বর্বর’ ধর্ম ইসলাম ৯:৬ আয়াতে বলছে, “পৌত্তলিকদের কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে তাকে আশ্রয় দেবে, যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পায়, অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌছে দেবে।” কোথায় বলা হয়েছে মারার কথা?

এতটুকু থেকে কি বিষয়টা নিশ্চিত নয় যে এটা আসলেই কেবল একটা নির্দিষ্ট ঘটনার জন্য? কিন্তু কেউ যদি আগ-পিছ না বলেই মাঝখান থেকে এই আয়াত উদ্ধৃত করে বসে, তবে যে কারো কাছে ইসলামকে খুনী আর বর্বর ধর্ম শোনাবে। তাই নয় কি? পাঠকদের জানাবার জন্য বলি, তাফসির ইবনে কাসির ও অন্যান্য তাফসির থেকে আমরা জানতে পারি যে, এই ঘটনাটা ঘটেছিল হিজরতের পর ষষ্ঠ বছরে (৬২৮ সাল) যখন মক্কার পৌত্তলিকেরা নিজেদের মিত্রদের নিয়ে মদিনাবাসী মুসলিমদের সাথে চুক্তি করে যে, কেউ কাউকে আক্রমণ করবে না। কিন্তু কুরাইশদের মিত্র বনু-বকর মুসলিমদের মিত্র গোত্র বনু-খুজা গোত্রের অনেককে হত্যা করে ফেলে। কুরাইশরা সেখানে অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে। ফলে চুক্তি ভেঙে যায় এবং ইসলাম কেবলমাত্র তখনই আক্রমণের আদেশ দিয়েছে যখন তাদের উপর আক্রমণ করা হয়েছে, এর আগে নয়।

যেই মক্কার পৌত্তলিকেরা ইসলামের প্রাথমিক যুগে এত এত নিরীহ মুসলিমকে নির্যাতন করেছিল, যাদের কারণে মক্কা ত্যাগ করতে হয়েছিল মুসলিমদের, সেই মক্কা যখন নবী (সা) বিজয় করতে এলেন ১০ হাজার মুসলিম সেনা নিয়ে, তখন মক্কাবাসীরা নিশ্চিত ছিল আজ তাদের কপালে প্রতিশোধের মৃত্যু আছে। কিন্তু তাই কি হয়েছিল? প্রায় বিনা রক্তপাতে বিজিত মক্কা নগরীতে সেই নির্যাতন করা কুরাইশ পৌত্তলিকদেরকে হযরত মুহাম্মাদ (সা) সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন! এ আদর্শ কি মেনে চলে সেই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো? ৯/১১ এর তিন হাজার নিরীহ মানুষ বিনা কারণে হত্যার মাঝে কি কোনো নবীর আদর্শ কাজ করেছিল? কিংবা ব্রাসেলসে হত্যাকাণ্ড? ফ্রান্সের নিস শহরে মানবনিধন? লন্ডনে আক্রমণ? গুলশানের নারকীয় হত্যাকাণ্ড? কিংবা সিরিয়াতে এখন যা চলছে? কিংবা ম্যাঞ্চেস্টারের কিশোরদের কন্সার্টে এতগুলো মানুষ মারা? ফ্রান্সের নিসে, বারলিন বা মাদ্রিদে? এগুলোতে কোনো নবীর আদর্শ আছে, নাকি আছে কোনো আয়াতের আদেশ? নবী (সা) হলে এই নিরপরাধ হত্যার দায়ে কী বলতেন?

ইসলামোফোবিকরা বলে থাকেন, তরবারির জোরে আসলে ইসলাম প্রসার হয়েছিল। ঐতিহাসিক বিবেচনায় এটা অস্বীকার করার জো নেই যে ইসলামি সাম্রাজ্যের প্রসারে যুদ্ধ আসলেই হয়েছিল, কিন্তু তারা ভুলে যায় যে এর আগে বাইজান্টিন সাম্রাজ্যও যে একইভাবে প্রসার পেয়েছে। তাই বলে কি খ্রিস্টানধর্ম-ফোবিয়া জনপ্রিয়? না। আচ্ছা তার আগে বলা যায় খ্রিস্টান আর ইহুদীদের হেনস্তা করত রোমান সাম্রাজ্য। কিন্তু রোমান/গ্রিক ধর্ম এখন তেমন নেই বলে ফোবিয়াও বলে না। যখন ‘ক্রুসেড’ কথাটা মাথায় আসে তখন কাদের কথা মনে হয়? খ্রিস্টানদের কথা। তাদের ধর্ম রক্ষার্থে তারা ‘সারাসিন’-দের (মুসলিম বাহিনী) বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল।

উমার (রা) এর সময় মুসলিমদের অধিকারে আসে জেরুজালেম। জেরুজালেমের নগরকর্তা সোফ্রোনিয়াস অবাক বিস্ময়ে দেখলেন কোনো জাঁকজমক ছাড়াই হযরত উমার (রা) তাঁর দাস আর গাধা নিয়ে জেরুজালেম এসেছেন। নগরকর্তা তাঁকে ঘুরিয়ে দেখালেন পবিত্র শহরটি। নামাজের সময় হলে সোফ্রোনিয়াস তাঁকে চার্চে আহ্বান করলেন, কিন্তু উমার “না” বললেন। তিনি জানালেন, এখন যদি তিনি এই চার্চে নামাজ আদায় করেন, তাহলে পরে মুসলিমরা এই চার্চ ভেঙে মসজিদ বানিয়ে ফেলতে পারে। এতে খ্রিস্টানরা তাদের খুব পবিত্র একটি স্থান হারিয়ে ফেলবে। উমার (রা) এখানে কোনো জবরদস্তি করানো থেকে বিরত করলেন। এটাই সেই জায়গা যেখানে খ্রিস্টানরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে যীশু খ্রিস্ট ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন আর এখানের গুহাতেই তাঁর দেহ রাখা হয়েছিল। উল্লেখ্য, সেই চার্চ বহু পরে (১০০৯ সাল) ফাতিমি খলিফা আল-হাকিম উমার (রা) এর আদেশ অমান্য করে ভেঙে ফেলেন। অবশ্য পরে (১০৪৮ সালে) পুনর্নির্মিত হয়। এখনো আছে সেটি, নাম হলো Church of the Holy Sepulchre.

উমার (রা) তখন চার্চের বাইরে বেরিয়ে নামাজ পড়লেন। পরে সেখানে আরেকটি মসজিদ বানানো হয়, নাম দেয়া হয় ‘মসজিদে উমার’।

মসজিদে উমার, জেরুজালেম। ছবিসূত্রঃ Lost Islamic History

ইহুদীদের জন্যও জেরুজালেম খুব পবিত্র জায়গা। খ্রিস্টান অধিকার থেকে মুক্ত করে উমার (রা) এ স্থানে ইহুদীদের পুনর্বাসনের জায়গা করে দেন। ৭০টি ইহুদী পরিবার এখানে চলে আসে। এই যে পরধর্মের ব্যাপারে যে অপূর্ব সহিষ্ণুতা তিনি দেখিয়েছিলেন, আজকের ইসলামোফোবিয়ার জন্য দায়ী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মাঝে কি তার রেশ মাত্র আছে? তাঁর এই কীর্তির মাঝে ধ্বনিত হয় সারা বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিমের হাজারও কোটিবার আবৃত্তি করা, “লাকুম দীনুকুম ওয়ালিয়াদীন” [কুরআন, সুরা কাফিরুন, ১০৯ঃ৫] বা “তোমাদের ধর্ম তোমার কাছে, আমার ধর্ম আমার।”

তখন থেকে শান্তিময় সহাবস্থানে ছিল মুসলিম, খ্রিস্টান আর ইহুদীরা। কিন্তু খ্রিস্টানরা মেনে নিতে পারেনি এটা। ১১০০ সালের দিকে প্রথম ক্রুসেডের সময় গ্রন্থিত Gesta Francorum নামের লাতিন ইতিহাসবিবৃতি থেকে আমরা বিস্তারিত জানতে পারি তখন কী হয়েছিল। ১৫ জুলাই, ১০৯৯ সালের ঘটনা সেখানে লেখা আছে, “আমাদের লোকেরা (খ্রিস্টান ক্রুসেডার বাহিনী) সলোমনের মন্দিরেও (বাইতুল মুকাদ্দাস) পর্যন্ত খুন করছিল, এত বেশি মানুষ হত্যা করেছিল যে রাস্তায় রক্তের স্রোতের কারণে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছিল।” এবং এ রক্ত ছিল মুসলিমদের। আর মুসলিমদের সাথে সেখানের শান্তিপ্রিয় ইহুদিরাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জেরুজালেম রক্ষা করতে যুদ্ধ করেছিল। ইবনে আল-ক্বালানিসির ইতিহাসগ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি ক্রুসেডারদের নির্মমতার কথা, “ইহুদীরা পরাজয়ের পর তাদের সিনাগগে (ইহুদী উপাসনালয়) জড়ো হয়, তাদের ভেতরে রেখেই পুড়িয়ে দেওয়া হয় সে সিনাগগ।” ইতিহাস কি এটা অস্বীকার করতে পারবে? শত বছর পর যখন সালাহউদ্দিন আইয়ুবী (যাকে পশ্চিমা বিশ্ব ‘সালাদিন’ নামে চেনে) যখন জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করেন মুসলিমদের জন্য, তখন খ্রিস্টানরা ভয়ে ছিল তিনিও একই কাজ করবেন কিনা। কিন্তু এই ‘বর্বর’ ইসলাম ধর্মের অনুসারী সালাদিন কী করলেন? তিনি কোনো নিরীহ খ্রিস্টান জেরুজালেমবাসীকে ফুলের টোকাও দেননি, শত বছর আগের রক্তস্রোত তো দূরের কথা। এমনকি ক্রুসেডার ইতিহাসেও মহৎপ্রাণ হিসেবে দেখা হয় সালাহউদ্দিনকে।

আর রাজ্যপ্রসারের ব্যাপারটা খুবই আপেক্ষিক। তখন ছিল ‘DO OR DIE’ নীতির প্রচলন। ছোট মুসলিম জাতি যদি কিছু না করে বসে থাকতো, তবে খুব শীঘ্রই রোমান/বাইজান্টিন সাম্রাজ্য বা পারস্য সাম্রাজ্য শক্তিবলে মুসলিম রাষ্ট্র দখল করে নিতো, তাহলে ইসলাম টিকে থাকতে পারতো না। তাই নিজস্ব শক্তি বাড়াবার জন্যই দরকার ছিল রাজ্য বিস্তারের। যেন বাহিনীর আকারও বাড়ে, আবার প্রতিবেশী শত্রু রাজ্য বাইজান্টিন বা পারস্য রাজ্য তাদের ওপর চড়াও হয়ে তাদের মুসলিম পরিচয় ধ্বংস করে দিতে না পারে। এটাকে ‘Survival instinct’-ও বলা চলে। এটা কেবল ইসলামের জন্য নয়, অন্য সকল রাজ্যের জন্যই প্রযোজ্য ছিল। আজকের দিনে এই ধারণাটা অদ্ভুত ঠেকে, কারণ এখন ছোট রাষ্ট্র হলেও কেউ তার সার্বভৌমত্ব নষ্ট করতে আসে না। তাই আজকের হিসাবে ১৪০০ বছর আগের কথা বিচার করা যায় না আসলে।

অনেকে বলেন, নবী (সা) তো বিনা বিচারে কুরাইজা বংশের অনেক ইহুদীকে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন, এটাও তো নির্মমতা। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, বনু কুরাইজার ঘটনা ইসলামে নবী (সা) এর জীবনীর সবচেয়ে ‘Debated’ এবং সবচেয়ে সমালোচিত ঘটনা- কারণ, বর্তমান দুনিয়ার হিসেবে আমরা সেটা কল্পনাও করতে পারি না। এর ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে আমরা তাফসির গ্রন্থে পাই ভিন্ন একটি কাহিনী, যার শিকড় অনেকদিন আগে প্রোথিত। ভুলে যাওয়া চলবে না যে, বনু কুরাইজার ঘটনার আগে দুবার পর পর দুটো ইহুদী গোত্র চুক্তি/সংবিধানের নিয়ম ভঙ্গ বা বিশ্বাসঘাতকতা করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করবার পর তাদের মদিনা থেকে বহিষ্কার করা হয় খায়বার নামক জায়গায়। তৃতীয়বার আরো বড় মাপের এক বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে এই বিশ্বাসঘাতকদের জন্য কেবল বহিষ্কার শাস্তি প্রদান করাটা তখনের হিসেবে গুরু পাপে লঘু দণ্ড হয়ে যেত বলে সিরাতকারীরা উল্লেখ করেন। তখন সেই কুরাইজার ইহুদীদেরই বাছাই করতে দেওয়া হয় একজন ‘বিচারক’। সেই প্রাক্তন ইহুদী পণ্ডিতের ফয়সালা তারা মেনে নিতে রাজি হয়, যেমন শাস্তি ইহুদীদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকতো আগে যদি বিশ্বাসঘাতকতা করে থাকে কোনো গোত্র বা জনপদ। নিজস্ব ধর্মগ্রন্থ তৎকালীন তাওরাতের Deuteronomy 20:12-13 আয়াতের রেফারেন্স হতে তাদেরই অপরাধের শাস্তিস্বরূপ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের হত্যা করা হয় যারা যোদ্ধা হবার যোগ্য ছিল; এ ঘটনা ইহুদী ইসরায়েলে আগেও প্রত্যাদেশিত হয়েছিল তাদের নিজস্ব গ্রন্থ অনুযায়ী। এক্ষেত্রে মুসলিম-চিন্তাটা এমন ছিলো যে, যদি বনু কুরাইজাকে হত্যা না করা হতো, তবে তারা আগের দুই নির্বাসিত ইহুদী গোত্রের সাথে গিয়ে সম্মিলিতভাবে মুসলিমদের উপর আক্রমণ করতো, তৃতীয়বার ক্ষমার পর চতুর্থবার একইভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে চাল দেবে এটা সকলেই ধরতে পারছিল। এটা ঠেকানো দরকার ছিল তখন মুসলিমদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবার জন্য। অপশন তখন নেমে এসেছিলো দুটোতে- ১) তাদের পুনরায় বহিষ্কার করে তিন ইহুদী গোত্রকে বড় জোট হয়ে মুসলিমদের উপর আক্রমণ করার সুযোগ দেওয়া অথবা ২) মুসলিম অস্তিত্ব রক্ষার্থে চরমতম শাস্তি দিয়ে বাকি গোত্রগুলোকে বিশ্বাসঘাতকতা বা চুক্তিভঙ্গ করার ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করা। ‘ইহুদী’ হওয়াটা এখানে মূল বিষয় ছিল না, অন্য কোনো বেদুইন গোত্র হলেও শাস্তি দেবার কথা ছিল। আগের দুবার লঘু শাস্তির পর তৃতীয়বার চরমতম দণ্ড। কিন্তু এই কাজ কেবল একবারই করা হয়েছিল। এ ব্যাখ্যাটা পাওয়া যায় সিরাত আর তাফসির থেকেই।

বর্তমানের চোখে নিষ্ঠুর এ শাস্তি এখনকার যুগে সমালোচিত, তবে তখনকার সময় অপরাধের শাস্তি হিসেবে অন্যান্য গোত্রও মেনে নিয়েছিল এটি। এটাকে এখনের চোখে ‘জাস্টিফাই’ কেউ করতে যাচ্ছে না। এবং এখানেই পার্থক্য টেররিস্ট অর্গানাইজেশনের সাথে সাধারণ মুসলিমদের। তারা ঠিকই পেছনের কাহিনীগুলো না জেনে কুরাইজা সাধন করে দিতে পারে।

এই একই নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) কিন্তু মক্কাবাসীদের ক্ষমা করেছিলেন, কারণ তারা বিশ্বাসঘাতক ছিল না। ইহুদীদের মধ্যে কেবল এই তিন গোত্রের সাথেই রাসুল (সা) এর শত্রুতা ছিল, আর কারো সাথে নয়। বাকি ইহুদীদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কই ছিল মুসলিমদের। কেবল যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তারা ব্যতীত বাকি ‘আহলে কিতাব’দের ব্যাপারে কুরআন খুবই উদার কথা বলেছিলঃ

“তারা সবাই সমান নয়। আহলে কিতাবদের মধ্যে কিছু লোক এমনও আছে যারা অবিচলভাবে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে এবং রাতের গভীরে তারা সেজদা করে। তারা আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামত দিবসের প্রতি ঈমান রাখে এবং কল্যাণকর বিষয়ের নির্দেশ দেয়; অকল্যাণ থেকে বারণ করে এবং সৎকাজের জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করতে থাকে। আর এরাই হলো সৎকর্মশীল।” [কুরআন ৩:১১৩-১১৫]

সত্যি বলতে ধার্মিকতার দিক থেকে মুসলিমদের পরই স্থান ইহুদীদের। ইসরায়েলের সাধারণ ইহুদীরা তাদের ধর্মের নিয়মকানুনের বিষয়ে ধার্মিক। অনেক মুসলিম আছেন যারা মুসলিম সমাজের নিজস্ব দোষ অনুসন্ধান না করে সকল কিছুকে ‘ইহুদী-নাসারা’ ষড়যন্ত্র আখ্যা দিতে পছন্দ করে। এটা সত্য যে, ‘জায়োনিস্ট’ বা ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাওয়া ইহুদীরা অর্থাৎ রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী ইহুদীরা ইসলাম ধর্মের ক্ষতি করেছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সকল ইহুদী খারাপ বা তারা সকলেই মুসলিমদের ধ্বংস চায়। যেমন নিচের ছবিগুলোতে আমরা দেখতে পাচ্ছি কয়েকজন ইহুদীকে যারা ‘জায়োনিজম’-এর বিরোধী, এটা অনেকের কাছেই হয়ত বিস্ময়কর ঠেকবে!

ইহুদী জায়োনিস্ট সন্ত্রাসী সংগঠন ইরগুন জাই লিউমি যখন ১৯৪৬ সালের ২২ জুলাই জেরুজালেমের কিং ডেভিড হোটেল উড়িয়ে দিয়েছিল, তখন থেকে কি ইহুদী ধর্মের উপর ‘সন্ত্রাসী’ তকমা লেগে গিয়েছিল? কিংবা জুডাইজমফোবিয়া (ইহুদিভীতি) শুরু হয়েছিল? হয়নি। অবশ্য মুসলিম সমাজে ইহুদীভীতি রয়েছে এবং ঘৃণাও রয়েছে যৌক্তিক কারণে- নিরীহ ফিলিস্তিনিদের উপর সন্ত্রাসী হামলাগুলোর কারণে। কিন্তু এটাও মাথায় রাখতে হবে যে, ইসরায়েলের সাধারণ ইহুদীরা চায় না এই হামলা হোক। তারাও শান্তিই চায়, যেমন মুসলিমরা চায়। (ইহুদী ধর্মের ইতিহাস জানতে চাইলে রোরের এ সিরিজটি পড়া শুরু করতে পারেন: ইহুদী জাতির ইতিহাস)

কুরআনে খ্রিস্টান সম্প্রদায়কেও প্রশংসা করা হয়েছে। তাছাড়া আবিসিনিয়ার নাজ্জাশির মহানুভবতার কথা ইসলামি ইতিহাস জানা যে কেউ জানেন। খ্রিস্টানদের থেকে ইহুদী নেতারা মুসলিমদের প্রতি বেশি শত্রুতা দেখিয়েছিল। এবং এখনো আমরা সেটা দেখতে পাই, ইসরায়েল ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে। কিন্তু সেই তুলনায় প্রাথমিক যুগে খ্রিস্টানরা অনেক নমনীয় ছিল মুসলিমদের প্রতি। এজন্য কুরআন বলছেঃ

“আপনি সব মানুষের চাইতে মুসলমানদের অধিক শত্রু ইহুদী (তারা জোট হয়েছিল তিন গোত্র) ও পৌত্তলিকদেরকে (তখন মক্কার কুরাইশ) পাবেন এবং আপনি সবার চাইতে মুসলমানদের সাথে বন্ধুত্বে অধিক নিকটবর্তী তাদেরকে পাবেন, যারা নিজেদেরকে খ্রিস্টান বলে। এর কারণ এই যে, খ্রিস্টানদের মধ্যে আলেম রয়েছে, দরবেশ রয়েছে এবং তারা অহঙ্কার করে না।” [কুরআন ৫:৮২]

বর্তমান বিশ্বে সাধারণ মুসলিমদের বেশিরভাগ অভিযোগ যাদের নিয়ে সেই ইহুদী রাষ্ট্র ইসরায়েলের মিত্রতা রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে। রাজনৈতিক স্বার্থে এরকম হতেই পারে বর্তমানে। কিন্তু পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার জের ধরে এই রাষ্ট্রীয় মিত্রতার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মানা করা হয়েছে কুরআনে ইহুদী বা খ্রিস্টানদের সাথে মিত্রতা করতে- “তোমরা ইহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে মিত্র হিসাবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের মিত্র।” [কুরআন 5:51]

মূলত বিশ্ব রাজনীতি আর ‘World Domination’ নামের ধারণাগুলোর কারণে সাধারণ মানুষ পড়ে যায় যাঁতাকলে। আর সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর কারণে সাধারণ ধার্মিকরা উভয় সংকটে পড়ে। এর থেকে মুক্তির উপায় কী?

‘Scripture’ বা ধর্মগ্রন্থ বলতে যা বোঝায় তা বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য থাকে তাফসির। সব ধর্মের ক্ষেত্রেই। যেমন ইহুদীদের রয়েছে তাওরাতের সাথে তানাখ বা তালমুদ। ফতোয়াও দেখা যায় স্থান আর সময়ভেদে মাঝে মাঝে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু কিছু জিনিস স্থির থেকে যায়, যেমন ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রে নামাজ, রোজা, যাকাত, হজ্ব- এগুলো আজীবনের জন্য ধ্রুব। কিন্তু প্রসঙ্গ না জেনেই যদি কেউ উল্টা পাল্টা আয়াত প্রয়োগ করতে থাকে তখনই হয় সমস্যা। যেমন কুরআনে আয়াত আছে মাতাল অবস্থায় যেন কেউ নামাজ আদায় না করে (৪:৪৩), অর্থাৎ মাতলামি কাটলে পড়তে হবে। এখন কেউ মদ খেয়ে যদি বলে কুরআনের নিয়ম ভাংলাম না, নামাজের সময় মাতাল থাকব না, তাহলে? কারণ ঐ আয়াত নাজিলের সময় তখনো মদ হারাম হয়নি ইসলামে। মোট চার ধাপে হারাম হয়। চূড়ান্ত নিষিদ্ধকরণ আয়াত আরও পরে আসে। এভাবে আসলে মাঝখান থেকে আয়াত শানে নুজুল ছাড়া নেওয়া যায় না। এর জন্য লাগে বিস্তারিত পড়াশোনা। এ জিনিসটা না করবার কারণেই আসলে ‘ব্রেইনওয়াশ’ ব্যাপারটা সহজে হচ্ছে। পড়াশুনা না থাকায় ধর্মকে ব্যবহার করা সন্ত্রাসীরা সহজে এমন মানুষকে হাত করতে পারে।

পেছনের কাহিনী না জেনে গুগল সার্চ থেকে শখানেক লাইন কপি-পেস্ট করে তর্ক করতে আসে অনেক ইসলামভীতি ছড়ানো মানুষ। তবে মেঘে আর বেগুনে আল্লাহর নাম আঁকা ফটোশপ করা ইমেজ দেখেই লাখখানেক সুবহানাল্লাহ কমেন্ট করা সেই পড়াশুনা না করা মুসলিমরাও হতাশার উদ্রেক করে! ধর্ম তো মানুষের কল্যাণের জন্যই সূচিত। অথচ কোনো এক কারণে ধর্মকে খোঁচা দিয়ে লিখে অনেকে স্বর্গীয় আনন্দ উপভোগ করেন, বিজ্ঞানের যুগে ধর্মের অসারতা প্রমাণ করে উল্লাস অনুভব করে থাকেন বা চর্বিত চর্বণের মতো ঘুরে ফিরে এক জাতীয় টপিক নিয়ে পড়ে থাকেন। যেমন- জনপ্রিয় একটি টপিক তাদের জন্য ‘নবীজীর বিবাহ’। তৎকালীন আরবে বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ অনেক কিছুই ছিল গ্রহণযোগ্য। এটার জন্য তাঁকে এমনকি তাঁর চরম শত্রুরাও অভিযুক্ত করে নি। কিন্তু ১৪০০ বছর বাদে আজ অনেক অভিযোগকারীর শেষ নেই। এখানে ‘Polygyny’ (বহুপত্নী) নিয়ে অনেকে অভিযোগ করেন। কিন্তু আমাদের কি এই অধিকার আছে হিমালয়ের কোলে যেসব গোত্র ‘Polyandry’ (বহুপতি) পালন করে, তাদের বিষয়ে বিচার করবার কিংবা নাক সিটকানোর? তাহলে ১৪০০ বছর আগের হিসেবে না করে কেন তারা এখনের হিসেবে ঐ বিষয়গুলো বিচার করে থাকেন? এমন তো নয় যে, সকলকে বহু বিবাহ করতে বাধ্য করেছে ইসলাম, বরং এক বিবাহই করতে বলেছে! মূলত ইসলামোফোবিয়া সৃষ্টির জন্য সন্ত্রাসীদের পর এই বিতর্কিত প্রশ্নগুলো উত্থাপনকারীরাই দ্বিতীয় স্থানে আছেন বোধ করি। অথচ ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা গভীরভাবে করলে সৌন্দর্যটুকু চোখে পড়ত। ইসলামোফোবিয়ার কথা আসতো না।

এটা সত্য যে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়া বাড়ছে। কিন্তু অদ্ভুত হলেও সত্য একই সাথে মুসলিমের সংখ্যাও বাড়ছে এবং কেবল ইমিগ্রেশনই এটার একমাত্র কারণ নয়। ২০১০ সালের Association of Religion Data Archives এর সমীক্ষা অনুযায়ী, ৯/১১ এর পর আমেরিকাতে মুসলিম জনসংখ্যা ৬৭% বেড়েছে, যার মধ্যে ধর্মান্তরিতরাও রয়েছে। ২০০০ সালে ১ মিলিয়ন মুসলিম ছিল আমেরিকাতে, ২০১০ সালে সেটা ২.৬ মিলিয়নে দাঁড়ায়। আর ২০১৫ সালে সেটা ৩.৩ মিলিয়ন হয়েছে। ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছেন এমন আমেরিকানদের বেশ কিছু সাক্ষাৎকার আমি আগ্রহ নিয়ে পড়েছিলাম, সেখানে তারা বলেছেন হয় তারা আগে ইসলাম নিয়ে জানতেনই না অথবা ইসলামোফোবিক ছিলেন একদম। এরপর যখন নিজে থেকে ইসলাম নিয়ে পড়া শুরু করেছেন, তখন ধর্মান্তরিত হয়েছেন।

২০১৭ সালের ১ মার্চ টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ মুহূর্তে জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তার চেয়েও বেশি হারে বাড়ছে মুসলিমদের সংখ্যা। ২০৫০ সালের মাঝে বিশ্বের জনসংখ্যা বাড়বে ৩৭%, কিন্তু মুসলিম জনসংখ্যা বাড়বে ৭৩%! এবং এই ধারায় চললে ২০৭০ সালে খ্রিস্টধর্মকে পিছনে ফেলে ইসলাম হবে সবচেয়ে বেশি মানুষের পালিত ধর্ম। এ ব্যাপারটা যথেষ্ট অবাক করার মতোই বটে। কারণ এত সন্ত্রাসী হামলার পরেও, এত ইসলামোফোবিয়া বাড়বার পরেও কেবল নিজস্ব পড়ালেখার কারণে ইসলামে ধর্মান্তর হবার হার এত বেশি কেন? তার মানে কি এই নয় যে আসলেই ইসলাম এই বর্বরতাগুলো সমর্থন করে না? এবং এগুলো ধর্মের নাম ব্যবহার করা সন্ত্রাসীদের কর্মই কেবল?

আপনি কীভাবে ধর্মকে নেবেন সেটা আপনার নৈতিকতার উপর নির্ভর করে। একই ফুল থেকে মৌমাছি নেয় মধু, আর মাকড়শা নেয় বিষ; একই চাকুতে কেউ আপেল কাটে, কেউ কাটে গলা! এটাই যদি না হয়, তাহলে কীভাবে একই কুরআন থেকে বিপরীত মেরুর ব্যাখ্যা দেয় সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো, আবার দেন একজন শান্তিপ্রিয় ধর্মপ্রচারক? একই ‘Scripture’ থেকে কেউ পায় শান্তির ধর্ম আর কেউ পায় মানুষ হত্যার বৈধতা! কুরআন বলছেঃ “যে ব্যক্তি নির্দোষ কাউকে হত্যা করল (হোক মুসলিম কি অমুসলিম) সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করল। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করল, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করল।” [কুরআন, ৫:৩২] বাগদাদের বাজারে ঈদের কেনাকাটা করতে আসা হাসিখুশি মানুষগুলোর কী দোষ ছিল? গুলশানের দোকানে খেতে যাওয়া ফারাজদের দোষ কী কেউ বলতে পারবেন?

ইসলামের নাম ভাঙিয়ে কেউ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করলে তাকে সন্ত্রাসী বলতে আর ইসলাম কে বর্বর বলতে আপত্তি করা হয় না মিডিয়াতে। কিন্তু সেই একই কাজ যদি অমুসলিম বা শ্বেতাঙ্গ কেউ করে থাকে, তবে গোড়াতেই তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়, নিদেনপক্ষে ‘মাস শুটার’। সম্প্রতি হয়ে যাওয়া ১৫ মার্চ ২০১৯ তারিখের নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটো মসজিদের ঘটনা দেখা যাক। সেখানে আল-নূর মসজিদে মারা যান ৪১ জন আর লিনউড মসজিদে ৮ জন। হত্যাকারী একজন White Supremist অর্থাৎ শ্বেতাঙ্গরাই সর্বসেরা এই নীতির প্রচারক, নাম ব্রেন্টন ট্যারান্ট। তার ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস যা-ই হয়ে থাকুক না কেন, তার বন্দুকের গায়ে লেখা হরেক রকমের লেখনি (যেমন MALTA 1565, VIENNA 1683, CHARLES MARTEL, TOURS 732 ইত্যাদি) সব নির্দেশ করে মুসলিমদের উপর খ্রিস্টানদের ঐতিহাসিক বিজয়গুলোর। অথচ তার পরিচয় হিসেবে দায়ী করা হয়নি খ্রিস্টধর্মকে। গোড়াতে তাকেও চেষ্টা করা হয় মানসিক ভারসাম্যহীন প্রতিপন্ন করতে, কিন্তু তার নিজের লাইভ ভিডিওতে গণহত্যা আর প্রকাশিত ম্যানিফেস্টো সেই উপায় আর রাখেনি, তাকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে ধর্মকে জড়ানো হয়নি। এমনটা কিন্তু ইসলামের নাম নিয়ে করা সন্ত্রাসেও হওয়ার কথা ছিল! সন্ত্রাসীর যে আসলে ধর্ম নেই!

ধর্ম নিয়ে অনেক অভিযোগেরই অনেকে উত্তর দিতে চায়, কিন্তু হয়ত দেয় না, কারণ সেক্ষেত্রে ইসলামবিরোধীদের কাছে গালি খেয়ে বসতে পারে, বা ‘Trolled’ হতে পারে। আবার ধর্মের সমালোচনা করতে গেলেও সংবেদনশীলদের কাছে গালি খেয়ে বসে না তা নয়। অথচ এমনটা না হয়ে যদি একটি সুস্থ, সুন্দর আলোচনা হতো, তবে বুঝিয়ে সুজিয়ে ইসলামভীতি দূর করা কোনো ব্যাপার নয়! দরকার শুধু একটু চেষ্টা, একটু পড়াশোনা। যদি আপনার পড়াশোনা করবার সুযোগ থাকে, আপনি কেন বসে রইবেন? আপনি পড়ুন আর অন্যকে জানান। হয়ত আপনার একটি কাজের জন্য একজন মানুষের ঘৃণা লোপ পাবে।

ক্যারেন আর্মস্ট্রং আমার প্রিয় একজন ধর্মতত্ত্ববিদ। তাঁর বলা একটা গল্প আমার খুব প্রিয়, দুই সহস্র বছরেরও আগে যখন খ্রিস্টধর্ম বা ইসলাম ধর্ম আসেনি, ইহুদি পণ্ডিত হিল্লেল-এর কাছে এক পৌত্তলিক এলেন, বললেন, “আপনি যদি এক পায়ের উপর দাঁড়িয়ে পা ফেলার আগেই ইহুদি ধর্মের মূলকথা বুঝিয়ে দিতে পারেন, তাহলে আমি এখনই বিশ্বাস আনব ইহুদিদের ঈশ্বরের উপর।”

হিল্লেল বললেন এক পায়ে দাঁড়িয়ে, “যা তোমার নিজের কাছে কষ্টদায়ক আর ঘৃণ্য, সেটা তোমার প্রতিবেশীর প্রতি করবে না কোনোদিন। এটাই হলো ধর্মগ্রন্থের মূল কথা। আর বাদ বাকি যা আছে পুরোটা তার ব্যাখ্যা। এখন যাও, পড়ো সেটা। বোঝো।”

আর্মস্ট্রঙের মতে, এটা হলো সকল ধর্মের সোনালি নীতি (‘Golden Rule’)। ঠিক এ নিয়মটা যদি সকল ধর্মাবলম্বী মেনে চলে তবে ধর্মীয় রেশারেশি কিংবা যুদ্ধ-বিগ্রহ উঠে যেত।

আপাতত দুর্ভাগ্যজনকভাবে নাইন ইলেভেন-পরবর্তী জঙ্গি ধর্ম হিসেবে বেস্টসেলারে পৌঁছে যাওয়া ইসলাম ধর্মের প্রসঙ্গেই আসা যাক। একটু আগে বলা সোর্ড ভার্স হিসেবে পরিচিত “যেখানেই অমুসলিম দেখবে, হত্যা করো”- এটা ইসলামোফোবিক এবং ধর্মবিদ্বেষীদের খুবই প্রিয় একটি রেফারেন্স। আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন, তারা জানে এর আগে পিছে অনেক কিছুই আছে যেটা পড়লে ‘শুধু’ এই চরণটা অসার হয়ে যায় অনেকটাই। কিন্তু কোনো মুসলিম যদি সত্যি সত্যি ‘কনটেক্সট’ বা ‘প্রসঙ্গ’ কথাটা বলতে আসে, তবে একটা খোঁচা বা বিদ্রূপ তাকে শুনতে হবে। যেন পেছনের কথা জানাটা একটা পাপ, আর প্রসঙ্গ ছাড়া উদ্ধৃতি দেওয়া একটা অধিকার, আর “দেখেছেন, আমিও জানি”- এই ভাব নেওয়ার একটা অজুহাত। হলফ করে বলা যায়, বেশিরভাগ ধর্মবিরোধী কেবল গোটা শয়েক পরস্পর বিরোধিতার লিস্ট থেকে কপি পেস্ট করতে ওস্তাদ। এর বাহিরে প্রশ্ন করলে, ওখানেই দৌড় শেষ। ব্যাপারটা কেবল ইসলামোফোবিকদের ব্যাপারে না, ধর্মপালনকারীদের ব্যাপারেও প্রযোজ্য। অনেকেই এরকম প্রশ্নের সম্মুখীন হলে প্রথমে ‘নাস্তিক’ গালি দিতেই পছন্দ করেন ব্যাখ্যা সহকারে উত্তর দেবার বদলে। অথবা কেউ হয়ত সেদিকে যানই না খোঁটা শুনবার আশংকায়।

ধর্মের উপযোগিতা প্রসঙ্গে আসি। ধর্মকে যদি কেবল একটা System হিসেবে দেখি অর্থাৎ বিশ্বাস অংশটুকু বাদ দিয়ে, তাহলে তার উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে অনেকের কাছে। কিন্তু এটা কি সবসময় এমনটাই ছিল? অনেকে বলে, ধর্ম না থাকলে সমাজটা কেমন ভিন্ন হত? একটা উদাহরণ শুরুতেই মাথায় আসে। শিশুহত্যা বা Child infanticide। বিশেষত সদ্যজাত মেয়ে শিশু যে মেরে ফেলা হতো।

ইসলামপূর্ব যুগে দারিদ্র্যের অজুহাতে এভাবে মেয়ে শিশু মেরে ফেলা হতোঃ

১) সরাসরি গর্তে পুঁতে ফেলা।
২) পাহাড় থেকে ছুড়ে ফেলে দেয়া
৩) পানি বা মদের ড্রামে ডুবিয়ে মেরে ফেলা
৪) জঙ্গলে ফেলে আসা, যেন হিংস্র জন্তু খেয়ে নেয়

একবার একজন এভাবে তার একটু বড় হওয়া মেয়েকে যখন মাটিতে পুঁতে ফেলছিল দাঁড়া করিয়ে, তখন লোকটার দাঁড়িতে ধুলো লাগে, মাটি লাগে। যে মাটি দিয়েই সে মেয়েটিকে কোমর পর্যন্ত পুঁতে ফেলেছে। মেয়েটি ভেবেছে এটা বুঝি একটা খেলা, কিন্তু বাবার দাঁড়িতে ধুলো দেখে সে সেটা ঝেড়ে দিল। প্রচণ্ড কষ্টের মাঝেও অনেকটা সামাজিক দায়বদ্ধতা (‘Norm’) থেকে সে মেয়েটিকে পুঁতে ফেলা থামালোই না।

বহু বছর পরে তার এই অতীত পাপ সে নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর কাছে বর্ণনা করছিল, আর দু’চোখ দিয়ে পানি বইছিল। নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) তাকে থামিয়ে দিয়ে সরে যেতে বললেন এই ভয়ংকর কাহিনী শুনে।

ইসলামে নিষেধের পর আর একটি শিশুও আরবে মুসলিম পরিবারে মারা হয়নি। ইসলামের আগে মক্কাবাসীরা বিশ্বাস করত না পরকালে শাস্তি দিতে আবার ওঠানো হবে, তাই এই খুনের বদলাও আর কোনদিন হবে না। প্রশ্ন হচ্ছে এক্ষেত্রে কি ইসলামের উপযোগিতা ছিল না? এই শিশুহত্যা কিন্তু ১৫০০ বছর আগে থেমে যায়নি, যুগে যুগে নানা সমাজে প্রচলিত রয়ে গেছে! তবে এ আয়াত আর পরকালের ভয়ের পর কি নৈতিকতা বদলে গেল মানুষের?

“(শেষ বিচারের দিন) যেদিন পুঁতে ফেলা জীবিত সেই মেয়ে শিশুটি জিজ্ঞেস করবে, কোন অপরাধে তাকে মেরে ফেলেছিল?” [৮১:৮-৯]

“দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমিই জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মারাত্মক অপরাধ।” [17:31]

এক লোক নবীর (সা) সামনে নিজের ছেলেকে চুমু খেয়ে এক পায়ের উপর আদর করে বসালো, কিন্ত সাথে থাকা মেয়েটিকে কিছুই করল না। এটা দেখে নবী সাথে সাথে বললেন আর কোনোদিন যেন এমনটা না করে। এরপর নবীজীর কথাতে লোকটি তার মেয়েকে চুমু খেয়ে অন্য কোলে বসালো।

Compassion বা ‘মমতা’ বস্তুটা ইসলাম ধর্মে উপস্থিত কিনা সেটা অনেকের প্রশ্ন। ‘কম্প্যাশন’ এর সঠিক বাংলা কী হতে পারে? দয়া? অনুকম্পা? ক্ষমাশীলতা? নাকি শুধুই মমতা? আজকাল ‘গেম অফ থ্রোন্স’-এর যুগে রাজ্য দখলের ব্যাপারে খুবই উৎসুকভাবে ভক্তরা বসে থাকে, এরপর কী হতে চলেছে? কিন্তু এটা যে হাজার হাজার বছর আগে একটা সাধারণ ব্যাপার ছিল সেটা মেনে নিতে বুঝি কষ্ট হয়। বাইজান্টিন আর্মি যেমন ছিল, পার্সিয়ান আর্মি যেমন ছিল, তেমনই মুসলিম আর্মিও ছিল। এবং অবধারিতভাবেই যুদ্ধ হয়েছিল। সাম্রাজ্য তো কোনোদিন বিনা যুদ্ধে বাড়েনি। একটু আগে সেটা ভালোভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

একটা জিনিস জানা জরুরি, নবী হযরত মুহাম্মাদ (স) এর মক্কা জীবন আর মদিনা জীবন আলাদা। তায়েফে যখন গিয়েছিলেন, তখন পাথরের আঘাতে রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে পায়ের জুতোয় জমাট বেঁধেছিল। মক্কার জীবনটা ছিল অত্যাচারময়, জীবন বাঁচাতে চলে যান মদিনায় এবং ঘুরে যায় মোড়। এবার তিনি শাসক। এক্ষেত্রে সব জায়গায় compassion বা মমতা দেখালে বা মাফ করে দিলে রাষ্ট্র চলবার কথা না। তাই নিয়মানুযায়ী সাজা তিনি দিয়েছেন বটে। এটাই কি অবাক করা না যে, একই মানুষের কীর্তিকলাপে আছে ইহুদী গোত্রের ইহুদী নীতি মাফিক কতল, আবার ১০ হাজার অস্ত্রধারী নিয়ে সেই অত্যাচারী মক্কা শহরে প্রায় বিনা রক্তপাতে প্রবেশ?

আসলে অবাক হবার নয়। একই যীশু বলেছেন, তোমাকে এক গালে কেউ চড় দিলে তোমার অন্য গাল পেতে দাও। আবার শেষে এসে অত্যাচারিত হয়ে তিনিই খ্রিস্টধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টে বলছেন, “Do not suppose that I have come to bring peace to the earth. I did not come to bring peace, but a sword.” [Matthew 10:34] এটা কি বাইবেলের প্রেমময় যীশুর পরস্পরবিরোধী কথা? নাকি নবী হযরত মুহাম্মাদ (স) এর মতোই কখনো নিষ্ঠুর আবার কখনো বা দয়ার অবতার হওয়া? এটা আসলে ইসলামের অপ্রাসঙ্গিক আয়াত উদ্ধৃত করে বর্বরতা প্রমাণের চেষ্টার মতোই ব্যাপার, কেবল খ্রিস্টান সংস্করণ।

এগুলোর পেছনের প্রত্যেক ঘটনার ব্যাখ্যা করতে গেলেই বই এর মতো হয়ে যেত। কিন্তু অনেকটা এক কথাতে বলতে গেলে, যস্মিন দেশে যদাচার। ইহুদীদের থেকে ব্যক্তিগতভাবে দূরে থাকতে বলা হলে, কোনোদিনই হযরত মুহাম্মাদ (স) ইহুদিনীর বাড়িতে দাওয়াত খেতে যেতেন না, যেতেন? বিশ্বাস করেই গিয়েছিলেন এবং গিয়ে জানলেন খাবারে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিলেন সেই ইহুদিনী। হযরত মুহাম্মাদ (স) তখন মারা যাননি। তাঁকে হত্যার চেষ্টাকেও তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন, কারণ মহিলাটির হাতে নবীর প্রাণ তো যায় নি; মহিলাটিকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সত্যি সত্যি যখন এক সাহাবী তার বিষ মেশানো গোশত খেয়ে মারা যায়, তখনই কেবল চূড়ান্ত শাস্তি দেওয়া হয় ইহুদী মহিলাটিকে।

মনে পড়া একটা ঘটনা দিয়ে এই বিশাল পোস্ট শেষ করি।

মক্কায় অতিষ্ঠ এক বুড়ি মক্কা ছেড়ে চলে যাবে। এই শহর নাকি তার থাকার অযোগ্য হয়ে পড়ছে। তাই বাক্স পেটরা নিয়ে তিনি মক্কা ত্যাগের জন্য রওনা দিলেন। কিন্তু বুড়ি মানুষ, এত কিছু নিতে পারছেন না, তাকে সাহায্য করতে এক লোক এলেন। নিজের কাঁধে মালামাল নিয়ে বুড়িকে এগিয়ে দিতে লাগলেন। বুড়ি তার সাথে গল্প জুড়ে দিল, তার প্রধান সমস্যা হলো ‘মুহাম্মাদ’ নামের এক নব্য উন্মাদ নাকি সবাইকে বিপথে নিয়ে চলেছে, দেবদেবীদের ছায়াও নাকি মাড়ায় না। যে শহরে এই বাপ-দাদার বিশ্বাস ধ্বংসকারী উন্মাদ থাকতে পারে, সেই শহরের খতম আসন্ন। এ জন্যই বুড়ি চলে যাচ্ছেন। এই মুহাম্মাদ নামের লোকটার চেহারাও তিনি দেখতে চান না জীবনে।

মাথা নেড়ে নেড়ে পুরোটা শোনার পর যখন পথ শেষ হয়ে এলো, তখন লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন বুড়ি, “এই শহরে তেমন বের হতাম না, অনেকদিন পর এরকম দয়ালু মহানুভবতা দেখলাম। তোমাকে খুবই ধন্যবাদ। তোমার নামটা তো জানা হলো না?”

“এতক্ষণ যার কথা বলছিলেন, আমিই সেই মুহাম্মাদ।” মুচকি না হেসে তিনি এরকম কথা কখনো বলতেন না।

বুড়ির মক্কা প্রস্থান পরিকল্পনা ওখানেই শেষ।

এটাকে বলা হয় compassion বা মমতা।

মিল পাচ্ছেন আদৌ এই দয়ার নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)-এর সাথে আজকের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কল্পিত মুহাম্মাদ (সা) এর?

ফিরে আসি সেই সোনালি নীতিতে, যদি সব ধর্মই এমনটা মেনে চলতো, তাহলে কোনোদিন ইহুদী মুসলিম দাঙ্গাও বাঁধত না, খ্রিস্টান-মুসলিম ক্রুসেড যুদ্ধও হতো না। হতো না Spanish Inquisition-এর যুগে খ্রিস্টানদের হাতে লাখো ইহুদী আর মুসলিমের প্রাণ হরণ, কিংবা হতো না গত শতাব্দীতে এসে ইহুদী গণহত্যা। আর সব শেষে, এই ইসলামি জঙ্গিবাদ কিছুই আসতো না।

তুমি নিজের জন্য যেটা কষ্টদায়ক মনে করো, সেটা অন্যের জন্য করো না। প্রত্যেক ধর্মের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যদি আপনার অনুসিদ্ধান্ত এখান থেকে সরে গিয়ে আক্রমণাত্মকতার দিকে ভীড়ে যায়, তবে বুঝতে হবে আপনার বোঝাতে ভুল আছে।

যার সাথে আপনার মতের মিল পড়ছে না তাকেই ‘কাফির’ উপাধিতে ভূষিত করা থামান, যাকে তাকে ইহুদী-নাসারার এজেন্ট বলে গালি দেওয়া বন্ধ করে দিন, যদি মনে হয় সে ভুল করছে, তবে ভদ্রভাবে বোঝান। “যে ব্যক্তি আরেকজনকে ‘কাফির’ বলে ডাকলো অথচ সে আসলে তা নয়, তবে যে ব্যক্তি এই কাজ করলো সে নিজেই কাফির।” [সহিহ বুখারি ৮ঃ৭৩ঃ১২৫ এবং সহিহ মুসলিম ১ঃ১১৭]

তর্ক করতে গিয়ে গালি দিয়ে বসবেন না। “তোমরা তাদেরকে গালি দিও না, যাদের তারা আরাধনা করে আল্লাহকে ছেড়ে।” [সুরা আনআম 6:108]

সেই নাইন ইলেভেনের সময়ের নয় বছরের ছোট আমি আজ ব্যাচেলর পাশ করে ফেলেছি, মাস্টার্সও শেষ প্রায়। যার জন্মদিনের কেক খাচ্ছিলাম সেদিন সেই খালাতো বোনটিও আজ বড় হয়ে ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। এই ছোট থেকে বড় হওয়া আমাদের প্রজন্মটা অনেক বিশাল কিছু পরিবর্তন দেখে বড় হয়েছে। দেখেছে যুদ্ধ আর হানাহানিতে ছেয়ে যাওয়া এক পৃথিবী, আর দেখেছে ধর্মকে সে যুদ্ধগুলোর বাহানা হিসেবে ব্যবহার করতে; দেখেছে ধর্মকে বর্ম করে সন্ত্রাসের চারণা। দেখেছে ইসলামফোবিয়ার পূর্ণরূপ।

পৃথিবীটা খুব খারাপ হয়ে পড়ছে। তবে মানুষ স্বপ্ন দেখে এখনও। একটি ইসলামোফোবিয়ামুক্ত সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন; ধর্মবিদ্বেষ আর হানাহানি অরাজকতামুক্ত এক পৃথিবীর আকাঙ্ক্ষা।

Abdullah Ibn Mahmud, Roar Bangla

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post স্বামীকে পাঠাতে গিয়েই ভাইরাল রাধিকার নগ্ন সেলফি!
Next post আমের মুকুল ও কুড়ি ঝরা রোধে করণীয়