৬৪ কোটি টাকা খরচেও মেলেনি নৌযান

জলে পড়ল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) ৬৪ কোটি ২০ লাখ টাকা।

মোটা অঙ্কের এই অর্থ খরচ করেও ‘এমভি বঙ্গমাতা’ এবং ‘এমভি বঙ্গতরী’ নামের দুটি যাত্রীবাহী নৌযান আজও সরবরাহ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

অথচ ঢাকা-বরিশাল-খুলনা নৌরুটে যাত্রী পরিবহণের কাজে ২০১৭ সাল থেকে এ জাহাজ দুটি বিআইডব্লিউটিসির বহরে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল।

বারবার সময় বৃদ্ধি ও আর্থিক সুবিধা দেওয়ার পরও একটিও নৌযান বিআইডব্লিউটিসিকে বুঝিয়ে দিতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিউ ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপ বিল্ডার্স।

ওই ব্যর্থতার দায়ে এ প্রতিষ্ঠানটিকে সম্প্রতি কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চট্টগ্রামের শিপইয়ার্ডেই পড়ে থাকা নৌযান দুটি যে অবস্থায় আছে ওই অবস্থায় হস্তান্তর করতে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

জানতে চাইলে নৌপরিবহণ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, সরকার চায় দেশীয় জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে যাক। এ কারণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে দেশীয় এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ দেওয়া হচ্ছে।

সেগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে নিউ ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপ বিল্ডার্স। প্রতিষ্ঠানটি সময়মতো জাহাজ সরবরাহ করতে না পারার পরও বিআইডব্লিউটিসি বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়েছিল বলে জানতে পেরেছি। এরপরও তারা জাহাজ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বাধ্য হয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

নির্মাণাধীন জাহাজ দুটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে বলে জানিয়েছেন বিআইডব্লিউটিসির একাধিক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, জাহাজ দুটি যে অবস্থায় শিপইয়ার্ডে রেখে দেওয়া হয়েছে তা ঝুঁকিপূর্ণ।

দীর্ঘদিন মাটির ওপরে এভাবে রেখে দেওয়ার কারণে বডিতে ফাটল দেখা দিতে পারে। মূল ইঞ্জিন, জেনারেটর ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়মিত চালু এবং নিয়ম অনুযায়ী তেল পরিবর্তন করা না হলে সেগুলোতেও বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আর ওই আশঙ্কা সত্যি হলে পুরো টাকাই জলে যাবে। তারা বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পারফরম্যান্স গ্যারান্টির মেয়াদ গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হয়ে গেছে। এরপর নবায়ন না করায় পারফরম্যান্স গ্যারান্টি হিসাবে থাকা চুক্তির ১০ শতাংশ টাকা এখন নিতে পারবে না বিআইডব্লিউটিসি।

এছাড়া দেরিতে কাজ দেওয়ার জরিমানা (এলডি) যা প্রায় ১৫ কোটি টাকার কাছাকাছি হলেও তা আদায় করা যাবে কিনা- তা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিন জাহাজ বহরে যুক্ত না হওয়ায় একদিকে যাত্রীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অপরদিকে সংস্থাটি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন্ন হচ্ছে।

জানা গেছে, ‘ঢাকা-বরিশাল-খুলনা নৌরুটের জন্য দুটি নতুন যাত্রীবাহী জাহাজ সংগ্রহ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এমভি বঙ্গমাতা ও এমভি বঙ্গতরী নৌযান সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৫ সালের ১ এপ্রিল শুরু হওয়া এ প্রকল্পটি শুরু হয়। এ দুটি জাহাজ নির্মাণে নিউ ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপ বিল্ডার্সের সঙ্গে পৃথক দুটি চুক্তি হয় ২০১৬ সালের ১ জুন ও ১৯ ডিসেম্বর।

২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রকল্প শেষ হওয়ার সময় নির্ধারিত ছিল। এ দুটি জাহাজ নির্মাণে ৬৭ কোটি ৭৫ লাখ ৭২ হাজার টাকার চুক্তিও হয়। নির্ধারিত সময়ে জাহাজ নির্মাণ শেষ করতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রথমে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয় ধাপে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। এ সময়ের মধ্যেও জাহাজ নির্মাণ কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হয় নিউ ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপ বিল্ডার্স। জাহাজ বুঝে না পেয়েই ইতোমধ্যে প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণা করেছে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়।

প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও নিয়মের বাইরে গিয়ে নতুন চুক্তির মাধ্যমে গত বছর ৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা নিয়ে যায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।

এই বিষয় নিয়ে দৈনিক যুগান্তরে ২০২০ সালের ২৮ জুন ‘এমভি বঙ্গতরী ও বঙ্গমাতা : নির্মাণ আটকে পুরো বিল নিচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান’ শিরোনামে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছিল। এই সংবাদ প্রকাশের পরও ওই ৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা বিল দেয় সংস্থাটি।

সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি আমদানির নামে ৬ কোটি ১০ লাখ এবং দেশীয় বাজার থেকে পণ্য কেনার জন্য ৫০ লাখ নিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি।

গতকাল পর্যন্ত ওইসব যন্ত্রপাতি কেনার জন্য কোনো এলসি খোলেনি। সংস্থাটির সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ওই টাকা নিয়েছিল।

সূত্র আরও জানায়, বিভিন্ন সময়ে নানা প্রতিশ্রুতি ও নতুন চুক্তির মাধ্যমে গতকাল পর্যন্ত ৬৪ কোটি ১৯ লাখ ৮২ হাজার টাকা নিয়ে গেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।

অথচ এ দুটি জাহাজ নির্মাণ সফলভাবে শেষ করার পর বিল দেওয়ার কথা ছিল ৬৭ কোটি ৭৫ লাখ ৭২ হাজার টাকা। অথচ দুটি জাহাজ নির্মাণে গড় অগ্রগতি ৭০ ভাগেরও কম। সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিসির একটি প্রতিনিধি দল ওই শিপইয়ার্ড পরিদর্শন করে জাহাজ নির্মাণ অগ্রগতি নিয়ে একটি রিপোর্ট দিয়েছে।

ওই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, এমভি বঙ্গতরী জাহাজের নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। জাহাজটির ইলেকট্রিক্যাল ডিপার্টমেন্টের আনুমানিক কাজ হয়েছে ৪০ শতাংশ, প্যানেলিং ডিপার্টমেন্টের কাজ ৬৫ শতাংশ ও পেইন্টিংয়ের কাজ ৫০ শতাংশ হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, এমভি বঙ্গমাতা জাহাজের কয়েকটি অংশে কাজ চলমান আছে। পেইন্টিং কাজ আনুমানিক ৫০ শতাংশ ও ইলেকট্রনিক্যাল ওয়্যারিং ৫ শতাংশ। প্যানেলিং ডিপার্টমেন্টের কোনো কাজ হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান আহমদ শামীম আল রাজী যুগান্তরকে বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে যে অঙ্কের টাকার বিল দেওয়া হয়েছে তার তুলনায় নির্মাণ কাজের অগ্রগতি কম হয়েছে। জাহাজ দুটির নির্মাণকাজের অগ্রগতি ঠিক কী পরিমাণ হয়েছে তা আমরা এখনো জানি না।

শিগগিরই একটি কমিটির মাধ্যমে পরিমাপ করে তা নির্ণয় করা হবে। কাজের অগ্রগতির তুলনায় বাড়তি বিল কীভাবে আদায় করা হবে-এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কমিটি কাজের অগ্রগতি নির্ধারণ করার পরই বর্তমানে যেই অবস্থায় আছে সেই অবস্থায় এ দুটি জাহাজকে আমাদের নিয়ন্ত্রণে আনা হবে। একই সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করে বাকি টাকা আদায় করা হবে।

আরও জানা গেছে, সম্প্রতি নিউ ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপ বিল্ডার্সকে কালো তালিকাভুক্ত করে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগে (আএমইডি) চিঠি দিয়েছে বিআইডব্লিউটিসি।

সংস্থাটির মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) জেসমিন আরা বেগম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, জাহাজ দুটি নির্মাণ শেষ করার লক্ষ্যে ২০২১ সালের ৪ মার্চ নতুন দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে ঠিকাদারের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়।

তারপরও জাহাজ দুটি নির্মাণকাজ শেষ করতে পারেনি ওই প্রতিষ্ঠান। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ২৮ জুন ও ১৭ নভেম্বর জাহাজ দুটিকে বিআইডব্লিউটিসিকে বুঝিয়ে দিতে বলা হলেও তা মানা হয়নি।

চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি জাহাজ দুটি না দেওয়ার ব্যর্থতা জানতে চেয়ে নোটিশ দেওয়া হলেও তার জবাবও দেয়নি। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্ত করা হলো। এ বিষয়টি জানিয়ে চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দর, বিআইডব্লিউটিএ, কোস্টগার্ড, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকেও চিঠি দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রামভিত্তিক ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান নিউ ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপ বিল্ডার্স লিমিটেড। ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের নামে এক সময় বিদেশে জাহাজ রপ্তানি করা হতো। আর নিউ ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপ বিল্ডার্সের নামে দেশীয় জাহাজ নির্মাণ করা হয়।

দুই প্রতিষ্ঠানের নামে একই শিপইয়ার্ড জাহাজ নির্মাণ করা হয়। পরিচালকরাও প্রায় অভিন্ন। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন সোহেল হাসান যুগান্তরের কাছে দাবি করেন, জাহাজ দুটির ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

ব্যাংকের সিবিআর সমস্যার কারণে আমরা কোনো পণ্য আমদানির এলসি খুলতে পারছি না। তা সমস্যা হচ্ছে। বিষয়টি জানিয়ে বিআইডব্লিউটিসিকে চিঠি দেওয়ার পরও আমাদের কালো তালিকাভুক্ত করা হলো।

উৎসঃ যুগান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post ১৫ দিনে হাজার কোটি টাকা লোপাট!
Next post শূকরের হৃদপিণ্ড বসানো সেই ব্যক্তি মারা গেছেন