লিটারে ৩৩-৩৫ টাকা নিচ্ছে সরকারই!

বর্তমান দর অনুযায়ী ভোজ্য তেলের লিটারে ৩৩-৩৫ টাকা ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আদায় করছে সরকার। দেশের বাজারে ভোজ্য তেলের এখন সর্বোচ্চ দাম। একইসঙ্গে সরকার সর্বোচ্চ মূসক আদায় করছে।

বাজেটে ১১ টাকা করে লিটারে ভ্যাট নেয়ার কথা বলা হলেও এখন তা নেয়া হচ্ছে ৩৩ থেকে ৩৫ টাকা করে। এই ভ্যাট কমানো হলে তেলের দাম অনেক কমে যাবে বলে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন।

এ ছাড়া ভোগ্যপণ্যে এত পরিমাণ ভ্যাট আদায় গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মনে করছেন তারা। অস্থিতিশীলতা ঠেকাতে আগামী তিন মাসের জন্য ভোজ্য তেল আমদানিতে ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশ ভারতে তিনবার ভ্যাট-ট্যাক্স সমন্বয় করা হয়।

আমরাও ভ্যাট-টাক্স সম্বনয় চাই।

গতকাল এফবিসিসিআই ভবনে ‘ভোজ্য তেলের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে এই প্রস্তাব রাখেন তিনি। সভায় এফবিসিসিআইয়ের পরিচালনা বোর্ডের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ভোজ্য তেলের বাজার পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ভর্তুকি কিংবা কর সমন্বয় করতে পারে। আমাদের প্রতিবেশী ভারতে এ পর্যন্ত তিনবার কর সমন্বয় করে ভোজ্য তেলের মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো একবারও হয়নি। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সঙ্গে সাক্ষাতে বিষয়টি তোলা হয়েছে। রোববার এনবিআর চেয়াম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমের সঙ্গেও কথা হয়েছে। আমি তাদের বলেছি আপনি যখন বাজেটটা করলেন তখন বললেন, আপনি প্রতিকেজি ভোজ্য তেলে ১১ টাকা ভ্যাট পাবেন। কিন্তু এখন ৩০ বা ৩৩ টাকা পাচ্ছেন, এটা কেন?

করোনা মহামারির কারণে পাল্টে যাওয়া বিশ্ব পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে মতবিনিময় সভায় এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসীম উদ্দিন বলেন, শিপিং কস্ট বেড়ে গেছে। সাপ্লাই চেন ভেঙে গেছে। সরকারের কাছে জোর দাবি জানাবো যে, আগামী অন্তত তিন মাসের জন্য ভ্যাট প্রত্যাহার করা উচিত বলে আমি মনে করি।

ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ছে এ অজুহাতে সবাই স্টক করছেন খোলা তেল। অনেকে বোতলের তেল খোলা হিসেবে বিক্রি করছেন। কিন্তু বিশ্ববাজারের আজ যে দাম বাড়ছে সে তেল তো দু’তিন মাস পরে দেশে আসবে। তাহলে কেন আজ দাম বাড়বে। আজকের দাম যেটা হবে সেই দামেই আপনারা বিক্রি করবেন। এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, কেউ ভোজ্য তেলের দাম বাড়িয়ে দেবেন না, স্টক করবেন না। কেউ অসাধু উপায় নিলে আমরা তাদের পক্ষে নেই। আজ প্যাকেটজাত তেলের চেয়ে বাজারে খোলা তেলের দাম বেশি, এটা মানা যায় না।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ২০ লাখ টন ভোজ্য তেলের চাহিদা রয়েছে। ২০২১ সালে ২৭ লাখ ৭১ হাজার টন ভোজ্য তেল আমদানি হয়েছে। সে হিসেবে তেলের মজুত ও সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে।

তিনি বলেন, মিল মালিকদের বাজারে তেল সরবরাহ ঠিক রাখতে হবে। আমরা জানি, দেশে যে পরিমাণ তেল আছে তা দিয়ে রমজান কাভার করা যাবে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম যেহেতু বেড়েছে আগামীতে সরবরাহ রাখতে অন্তত তিন মাস তেল আমদানিতে ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানাই।

এ সময় ভোজ্য তেল ব্যবসায়ী সমিতি, পাইকারি ব্যবসায়ী সমিতি এবং আমদানিকারকদের নিজস্ব ব্যবস্থায় পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানিয়ে মজুতদার এবং বেশি দামে তেল বিক্রি করাসহ নিয়ম লঙ্ঘনকারী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেন তিনি। এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকেও বাজার পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান শীর্ষ এই ব্যবসায়ী নেতা।

ব্যবসায়ীদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জসীম উদ্দিন বলেন, বর্তমান সরকার ব্যবসাবান্ধব সরকার বলে ব্যবসায়ীদের সুবিধার জন্য ভোজ্য তেল আমদানির সুযোগ দিয়েছে। অথচ আগে এটা সরকারের কাছে থাকতো। বন্ডের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের দেয়া হতো। তখন স্টকটা সরকারের কাছেই থাকতো। যার যত দরকার দিতো।

আপনারা সরকার এবং দেশের মানুষকে সহযোগিতা না করলে আমি সরকারকে আবারো তেলের স্টক সরকারের কাছে রাখার পরামর্শ দেবো।

সভায় মেঘনা গ্রুপের সিনিয়র এজিএম তাসলিম শাহরিয়ার বলেন, গত বছর আমরা ১১৮০ ডলারে তেল আমদানি করেছি। এক বছর পর আজ বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১৯০০ ডলার হয়েছে। এক বছরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে ৬১ শতাংশ। আর একই সময়ে দেশের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির হার ২১ শতাংশ। তিনি বলেন, একমাস আগে তেল এসেছে ১৪৫০ ডলারে, আজ বিশ্ববাজারে দাম চড়া। দেশের পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে, আমরা চার মিল একদিকে আর পুরো দেশ একদিকে। অথচ বাংলাদেশি ১৭৭ টাকায় তেল বিক্রি হচ্ছে ভারতে, সেখানে আমদানিতে ডিউটি ফি কম, আমাদের বেশি।

তবে এই তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে এফবিসিসিআই সভাপতি জসীম উদ্দিন উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, বিশ্ববাজারের আজকের রেট হিসাব করে আপনি গড় করছেন। অথচ আজকের বিশ্ববাজারের তেল তো আপনার কাছে নেই। সরকার এবং দেশের মানুষের সঙ্গে অন্যায় করবেন না বলে জানান জসীম উদ্দিন।

গত কয়েক মাসে ভোজ্য তেল আমদানির তথ্য তুলে ধরে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, একমাস বা দুই মাস আগে এক হাজার, ১২০০ বা ১৩০০ ডলার করে যারা আমদানি করেছেন তাদের কাছে তেল জমা আছে। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে ১ হাজার ৮০০ ডলার হয়ে গেছে। যাদের কাছে আগের কমদামে কেনা তেল জমা আছে তারা আজকের আন্তর্জাতিক বাজারের দামে বিক্রি করতে চাচ্ছেন। তিনি বলেন, সামনে রমজান মাস। ব্যবসায়ীরা এভাবে করলে মানুষ কষ্টে পড়ে যাবে। মানুষকে সহযোগিতা করুন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে উৎসব আসলে পণ্যের দাম কমিয়ে দেয়, কিন্তু আমাদের দেশে উল্টো।

সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, বাজারে কোনো কৃত্রিম সংকট নেই। প্রতিদিন দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টন তেল সিটি গ্রুপের কারখানা থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। বাজারে কোনো ক্রাইসিস থাকার কথা নয়, তবুও ক্রাইসিস করছে। এখানে বাজার মনিটরিং জোরদার করা দরকার। পাশাপাশি আগামী কোরবানি পর্যন্ত ভ্যাট কমানোর দাবি জানাচ্ছি।

এস আলম গ্রুপের সিনিয়র মহা-ব্যবস্থাপক কাজী সালাহউদ্দিন আহাম্মদ বলেন, সরকারের কাছে আমরা দামের প্রস্তাব দিয়েছি। এ কারণে হয় তো সংকট তৈরি করা হচ্ছে। এখানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কিছু সমন্বয় করলে আর বাড়ানোর প্রয়োজন পড়বে না।

টি কে গ্রুপের পরিচালক শফিউল তাছলিম বলেন, প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে সরকার ২৫ থেকে ২৭ টাকার রাজস্ব পায়। বর্তমান সময়ে এই রাজস্ব ছাড় দিলে রমজান পর্যন্ত তেলের বাজারে কোনো সংকট থাকবে না। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় থাকা দরকার।

সভায় বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্য তেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী মো. গোলাম মাওলা আমদানিকারক ও মিলারদের অব্যবস্থাপনা এবং পাইকারি বিক্রেতাদের সময়মতো তেল না দেয়ার কারণে দামে প্রভাব ফেলছে বলে জানান। অনেক মিল সরবরাহ করছে না বা দেরি করছে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বা মিল গেটে গিয়ে টাকা দিয়ে তেল পাওয়া যায় না। তেল আনতে যে ট্রাক পাঠানো হয় তেল না পাওয়ায় সেই ট্রাক পাঁচদিন পর্যন্ত বসিয়ে রাখতে হয়। এই পাঁচদিনের বসা ট্রাক ভাড়া আমাদের দিতে হয়। এরফলে আমাদের ওই ভাড়া তেলের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। এর ফলে তেলের দাম বেড়ে যায়। সরবরাহ ঠিক থাকলে বাজার নিয়ন্ত্রণ থাকবে। মিল থেকে ঠিকমতো সরবরাহ করলে বাজার রিলাক্স থাকে। পুরো দেশ কয়েকটি মিল মালিকের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। তবে তিনি বলেন, ৩৩ থেকে ৩৫ টাকা ভ্যাট প্রত্যাহার করলেই তেলের দাম কমে যাবে।

ব্যবসায়ী এই নেতা বলেন, কয়েকদিন ধরে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো আচরণ করছে। অভিযানের নামে অন্যায্য চাপাচাপি করছে। এভাবে চাপাচাপি না করে ব্যবসায়ীদের তেলের যোগান ঠিক করে দিলে আমরা ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু আপনি আমার তেল পাওয়ার ব্যবস্থাও করতে পারবেন না আবার চাপাচাপিও করবেন, তা হতে পারে না। যেখান থেকে তেল বের হয় সেখানে অভিযান চালানোর পরামর্শ দেন তিনি।

মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি বশির উদ্দিন বলেন, মিল গেটে তেলের জন্য গিয়ে ১৫ দিন পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে এ রকম ঘটনাও আছে। অথচ যে কে কোনো মুহূর্তে তেল পাওয়া যেতে পারে এমন পরিস্থিতির জন্য আমরা ট্রাকও ছেড়ে দিতে পারি না। এতে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত গচ্চা দিতে হয়।

দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, প্রতি ১৫ দিন পর পর দাম নির্ধারণ করে দেয়ার দাবি জানাই। এতে প্রয়োজনে বাড়বে বা কমবে। আপনারা সরবরাহ ঠিক রাখলে সমস্যার কথা না।

ব্যবসায়ীদের কথা শুনে এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, মনে হচ্ছে সংকট ভয়াবহ না, কিন্তু কেন ভয়াবহ হবে। আজকের কথা কিন্তু রেকর্ড হচ্ছে, সবাই যে দামের কথা বলছেন সে দামে বিক্রি করবেন। আমরা প্রয়োজনে বাজার মনিটরিং সেল বাড়াবো, খোঁজ রাখবো, সরকারকে সব জানাবো। আবার খোলা তেলে কেন বোতলের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হবে। আমি খোলার পক্ষে না সব প্যাকেটজাত হোক। ছোট পাঁচ টাকার শ্যাম্পু বিক্রি হলে ১০০/২০০ গ্রামের তেল প্যাকও হতে পারে।

তিনি বলেন, খোলা তেল বিশ্বে কোথাও নেই, এটা বন্ধ করার দাবি জানাই। তেলের কোথাও সংকট নেই, তাহলে কেন দাম বাড়বে। এ মুহূর্তে ক্যাপাসিটি অনুযায়ী তেল আছে তাহলে কেন দাম বাড়বে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে আজই আমাদের এখানে কেন বাড়বে? এ কালচার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা চোর-বাটপারের পক্ষে না। আমি কোনো অসাধু ব্যবসায়ীর পক্ষ নেবো না।

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআই’র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু, সহ-সভাপতি মো. হাবীব উল্লাহ ডন, পরিচালক হারুন অর রশীদ, আবু হোসাইন ভূঁইয়া (রানু), মহাসচিব মোহাম্মদ মাহফুজুল হক, মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. বশির উদ্দিন।

উৎসঃ মানবজমিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post ধ্বংসের পথে রুশ এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি, উ. কোরিয়ার মতো পরিণতির আশঙ্কা
Next post বাঁশ দিয়ে নির্মাণ হলো ২ কোটি টাকার সেতু