মোদির মুসলিমবিরোধী জিহাদ

এ কে এম মাকসুদুল হকঃ ভারতের খ্যাতিমান কলামিস্ট শশী থারুর বাংলাদেশের ইংরেজি দৈনিক ‘দি ডেইলি স্টার’ পত্রিকায় একটি কলাম লিখেছেন, যার নাম “গড়ফর’ং অহঃর-গঁংষরস ঔরযধফ” অর্থাৎ ‘মোদির মুসলিমবিরোধী জিহাদ’।

এই কলামে তিনি মোদির মুসলিমবিরোধী বিভিন্ন পদক্ষেপের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরেছেন। এতে দেখা যায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতের মুসলমানদের নিধনের লড়াইয়ে নেমেছেন।

গুজরাটে ২০০১ সালে দাঙ্গা বাধিয়ে হাজারো মুসলমান হত্যায় সহযোগিতা করে এর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতের হিন্দুত্ববাদের প্রাণভ্রমর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ফলে তিনি হিন্দু জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করে ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। এরপর থেকে তিনি মুসলিম জনগোষ্ঠীকে জাতীয়ভাবে নির্যাতনের শিকারে পরিণত করেন। ফলে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের বিপুল সমর্থন অর্জন করে ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করেন। এমতাবস্থায় তার ও তার রাজনৈতিক দল বিজেপি এবং সন্ত্রাসী দল ‘আরএসএস’ ভারতজুড়ে দ্বিগুণ উৎসাহে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার ও নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে, যার সর্বশেষ সংস্করণ হলো হিন্দু উগ্রবাদী নেতাদের মুসলমানগণকে গণহত্যার আহ্বান জানানো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুসলমান ছাত্রীদের ধর্মীয় সাংস্কৃতিক পোশাক হিজাবকে ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষণা করা।

নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় আসামে মুসলিম নিধনের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে হিন্দু জাতীয়তাবাদকে উসকে দিয়ে মুসলমান উচ্ছেদের অভিযান শুরু করেছে রাজ্য সরকার। নথিপত্র সূত্রে প্রমাণিত, মুসলমান নাগরিকদের তারা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আশ্রয় নেয়া শরণার্থী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করছে। রাজ্যের এক-তৃতীয়াংশ তথা ২০ লাখ মুসলমান এই অভিযানে একটি ভীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। ২০১৯ সালে শরণার্থীবিষয়ক আইন চালু করে মুসলমানদেরকে বাদ দিয়ে অন্য পাঁচটি ধর্মাবলম্বীদেরকে নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়।

এই নাগরিকত্ব পর্যালোচনার নামে প্রায় তিন লাখ ৩০ হাজার মানুষকে নাগরিকত্বহারা করা হয়, যার বেশির ভাগই হলো মুসলমান। ফলে শুরু হয় উচ্ছেদ অভিযান। দশকের পর দশক ধরে বসবাসের বাস্তুভিটা থেকে মুসলিমদের উচ্ছেদ করে সেই জমি ভ‚মিহীন হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিলি-বণ্টন করে দেয়া হয়। সম্প্রতি আসামের দরং জেলায় ধলপুর হিলস ও সিপাহঝাড় এলাকায় ৭৭ হাজার বিঘা জমি থেকে মুসলমান নাগরিকদের উচ্ছেদ করে একটি প্রাচীন শিবমন্দিরকে দেয়া হলো বড় আকারের মন্দির কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য। এতে প্রায় ৮০০ পরিবারের বেশ কয়েক হাজার মানুষ বাস্তুহারায় পরিণত হয়। এর প্রতিবাদ করলে গত ২৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ গুলি করে দু’জন মুসলমান প্রতিবাদকারীকে হত্যা করেছে। নিহতদের একজন, মইনুলের লাশের উপর উঠে প্রশাসনের একজন ফটোগ্রাফারকে নৃত্য করতে দেখা যায়। পরে তার লাশ বুলডোজার দিয়ে বেঁধে ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় (নয়া দিগন্ত : ২৬/০৯/২০২১ এবং ২০/১০/২০২১)।

মোদি সরকার ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর সংসদে নাগরিকত্ব আইন পাস করে। এই আইন মোতাবেক বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান থেকে নির্যাতনের শিকার অমুসলিম নাগরিকরা ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪ সালের আগে ভারতে প্রবেশ করলে তারা সবাই ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রাপ্তির উপযোগী বলে বিবেচিত হবে। বৈষম্যমূলক এই আইন প্রকৃত অর্থে মুসলমানবিরোধী আইন। এতে ভারতের মুসলিম সংখ্যালঘু নাগরিকরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয়েছে। অন্য দিকে প্রতিবেশী বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের রাষ্ট্র এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীকে অপমান করা হয়েছে। অর্থাৎ কট্টর ইসলামবিরোধী মনস্তত্ত¡ থেকে মোদি সরকার এই আইনটি প্রণয়ন করেছে।

মোদির বর্ণবাদী আচরণ মুসলমান নাগরিকদের কোণঠাসা করে ফেলেছে। বর্তমান ভারতের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে একটিতেও মুসলমান মুখ্যমন্ত্রী নেই। ১৫ রাজ্যে একজনও মুসলমান মন্ত্রী নেই। ১০ রাজ্যে একজন করে মুসলমান মন্ত্রী আছেন, যাদের দায়িত্ব হলো সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রণালয় দেখভাল করা। লোকসভায় বিজেপির ৩০৩ সদস্যের একজনও মুসলমান নন (আকার প্যাটেল, প্রথম আলো: ২৮/০১/২০২২)। আর সরকারি চাকরিতে মুসলমানদের দুরবস্থার কথা শশী থারুর এভাবে বলেছেন,“Today, Muslims are dramatically underrepresented in the police forces and elite central administrative services and they are overrepresented in the prisons” (প্রথম আলো : ২৩/১১/২০২১)।

সম্প্রতি আসামে মাদরাসাশিক্ষা আইনকে সংশোধন করে সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত মাদরাসাগুলোতে ইসলামী শিক্ষা বন্ধ করে সাধারণ স্কুল কারিকুলাম চালু করা হয়েছে। এ ব্যাপারে ক্ষতিগ্রস্ত মুসলিম সম্প্রদায় আদালতে গেলে হাইকোর্ট সেই আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন। অন্য দিকে বিশ্বখ্যাত দেওবন্দ মাদরাসার বিরুদ্ধেও কৌশলে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। ১৮৬৬ সালে মাদরাসাটি উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিশুদ্ধ ইসলামী শিক্ষার প্রসারে কাজ করছে। ভারতসহ আঞ্চলিক এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ছাত্ররা এখানে লেখাপড়া করতে আসে। এমনকি বিবিসির সাংবাদিক জন বাট এই প্রতিষ্ঠানে ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এখানে তিনি উগ্রবাদের কিছুই দেখেননি। সেই দেওবন্দ মাদরাসার পাশেই গত জানুয়ারিতে সন্ত্রাসবাদবিরোধী ‘প্রশিক্ষণকেন্দ্র’ স্থাপন করে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বলেছেন, সন্ত্রাসবাদীদের বার্তা দিতেই এই কেন্দ্র খোলা হয়েছে (প্রথম আলো : ০৯/০২/২০২২)। এ দিকে দেওবন্দ মাদরাসার ওয়েবসাইট থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের শিশুবিষয়ক দু’টি ধর্মীয় ফতোয়া স্থানীয় প্রশাসন বন্ধ করে দিয়েছে।

মুসলিমবিদ্বেষের বিষাক্ত নিঃশ্বাস প্রকৃতির ওপরও পড়েছে। দক্ষিণ দিল্লির পৌর করপোরেশনের অধীনস্থ গ্রামের নাম ‘মোহাম্মদপুর’কে পরিবর্তন করে ‘মাধবপুরম’ করার প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সরকারের রাজস্ব বিভাগে প্রেরণ করা হয়েছে। এর আগে ‘আলিগড়’কে পরিবর্তন করে ‘হারগড়’; ‘মঈনপুরী’কে ‘মায়ান নগর’; ‘এলাহাবাদ’কে ‘প্রয়াগরাজ’; ‘মুঘলসরাই’কে ‘দীনদয়াল উপাধ্যায় নগর’ ও ‘ফৈজাবাদের’ নামকে পরিবর্তন করে ‘অযোধ্যা’ করা হয়েছে (নয়া দিগন্ত : ২৮/০৮/২০২১)।

কেন্দ্রশাসিত, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মিরকে হিন্দুত্ববাদের করতলে নিয়ে আসার জন্য গত ২০১৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ভারতীয় পার্লামেন্ট একতরফাভাবে সংবিধানের ৩৭০নং ধারা অবলোপন করে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন এবং বিশেষ মর্যাদা বিলুপ্ত করে। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালের ১ এপ্রিলে করোনা মহামারীর অন্তরালে গভীর রাতে কেন্দ্রীয় সরকার প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তি জারির মাধ্যমে কাশ্মিরের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করে এবং এর মাধ্যমে সেখানে সারা ভারতের সব নাগরিকের সরকারি চাকরিতে যোগদান করার সুযোগ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।

ভারতের কাশ্মির ছাড়া একমাত্র মুসলিমপ্রধান এলাকা, লাক্ষাদ্বীপ যেখানে ৯৮ শতাংশই মুসলমান। সেখানে কয়েক দশক ধরে চলে আসা স্কুলগুলোর শুক্রবার ছুটি বাতিল করা হয়েছে শিক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকে। গরুর গোশত খাওয়া নিষিদ্ধ করা, হোটেল-রিসোর্টগুলোতে অ্যালকোহল বৈধ করা, স্কুলে মিডডে মিলে শুধু নিরামিষ খাবার দেয়ার ব্যবস্থা এবং দুইয়ের অধিক সন্তানের বাবা-মাকে পঞ্চায়েত নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা ইত্যাদির মাধ্যমে ৯৮ শতাংশ মুসলমানের এই অঞ্চলে ব্যাপক নির্যাতনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এ দিকে অন্যায়ভাবে উত্তরপ্রদেশের ডাক্তার কফিল খানকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ২০১৭ সালে গোরক্ষপুরের বিআরডি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৬৩টি শিশু অক্সিজেনের অভাবে ভুগছিল। খবর পেয়ে ছুটিতে থাকা কফিল খান ছুটে এসে পরিচিত শিল্পকারখানা থেকে অক্সিজেন ধার করে নিয়ে এসে চেষ্টা করেও শিশুগুলোকে বাঁচাতে পারেননি। ওখানে দীর্ঘ দিনের বকেয়া থাকায় ব্যবসায়ীরা অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। আগেভাগেই সরকারকে এ ব্যাপারে জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তদন্তের পর আটজন ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীকে বরখাস্ত করে পরে তাদেরকে পুনর্বহাল করা হলেও মুসলমান হওয়ার কারণে শুধু শিশুরোগী বিশেষজ্ঞ ডা: কফিল খানকে বরখাস্ত করা হয়। আবার পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের সন্তান ডা: কবিউল হক টানা এক মাস ধরে কলকাতায় সল্টলেক সেক্টর থ্রি এলাকায় বাড়ি খুঁজছেন; কিন্তু মুসলমান বলে তাকে কেউ বাড়ি ভাড়া দিচ্ছে না বলে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন।

হিন্দুত্ববাদের সর্বশেষ ছোবল দেয়া হয়েছে মুসলমান ছাত্রীদের হিজাব নিষিদ্ধ করে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা ইসলামী শরিয়ত, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ভ‚লুণ্ঠিত করে হঠাৎ কর্নাটকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ছাত্রীদের হিজাব পরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ছাত্রীরা আদালতের শরণাপন্ন হলে আদালতও হিন্দুত্ববাদী আচরণ করে। আদালত মামলা নিষ্পত্তির আগ পর্যন্ত উল্টো নতুন বিধি মেনে চলার আদেশ বহাল রেখে হিজাব না পরার নির্দেশ দেয়। এ দিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব খুলতে বাধ্য করা হচ্ছে। এভাবে অনেক ছাত্রীর শিক্ষাজীবনে নেমে আসছে অন্ধকার।

সার্বিক বিচারে ভারতের সাধারণ জনগণের মধ্যে ‘মুসলিম ভীতি’ না থাকলেও মোদির রাজনৈতিক দল বিজেপি মুসলিম ভীতিটাকে পুঁজি করে রাজনীতি করে চলছে এবং তাদের মূল সংগঠন ‘আরএসএস’-এর মাধ্যমে এই মুসলিম নির্যাতন প্রক্রিয়াকে বাস্তবায়ন করছে। মোদি নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন, মুসলমানদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক দেখেই ভারতের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ বা আন্দোলনকে চিহ্নিত করতে হবে। এমনকি ‘বিজেপি’র শীর্ষ নেতা অমিত শাহ বাংলাদেশী মুসলিম অভিবাসীদের উইপোকার সাথে তুলনা করে এদের একটি একটি করে বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করার প্রতিজ্ঞা করেছেন।

এমন বাস্তবতায় বিশ্ববিখ্যাত পণ্ডিত অধ্যাপক নোয়াম চমস্কি বলেছেন, ‘ভারতে ইসলাম ভীতি সবচেয়ে মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। প্রায় ২৫ কোটি মুসলমানকে নির্যাতিত সংখ্যালঘুতে পরিণত করেছে ভারত (নয়া দিগন্ত : ১৩/০২/২০২২)। সত্যিকারার্থে মোদির শাসনের আগে ভারতে এত মুসলমান নির্যাতন আর হয়নি। কারণ নরেন্দ্র মোদি এবং তার দল বিজেপি মূলত মুসলমানদের নির্যাতনের মাধ্যমে হিন্দুত্ববাদকে উসকে দিয়ে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ভোটের রাজনীতি করেই ক্ষমতায় আরোহণ করেছে এবং এই নীতিকে ব্যবহার করেই আজীবন ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তবে এই নীতি হবে ভারতের জন্য আত্মঘাতী এবং সার্বিকভাবে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের রূপান্তর ঘটবে সাম্প্রদায়িক ও সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post আন্দোলন নিয়ে যা বললেন জামায়াতের আমীর
Next post উভয় সংকটে বাংলাদেশ সরকার: একইসাথে নাখোশ পশ্চিমারা ও রাশিয়া