ইউক্রেনে রুশ যুদ্ধ কৌশল রহস্যময়

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সমর বিশেষজ্ঞদের ধারণাকে পিছু ফেলে ইউক্রেনে এক রহস্যময় যুদ্ধ কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে রুশ বাহিনী। ইউক্রেনে তিন রুশ সেনা অধিনায়ক নিহত হয়েছেন।

ইউক্রেনের শত্রুপক্ষের খুব কাছাকাছি যাওয়ার পর রাশিয়ার সেনাবাহিনীর অন্তত তিনজন অধিনায়ক নিহত হয়েছে বলে পশ্চিমা দেশের কর্মকর্তারা বলছেন।

তাদের উদ্ধৃত করে বিবিসির নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদদাতা গর্ডন কোরেরা জানাচ্ছেন, রুশ ৩১তম কম্বাইন্ড আর্মস আর্মির উপ-প্রধান এক স্নাইপারের গুলিতে নিহত হয়েছেন।

একজন ডিভিশনাল কমান্ডার এবং রেজিমেন্ট কমান্ডার নিহত হন। রুশ বাহিনীর কোনো কোনো অধিনায়ক সৈন্য নিয়ে রণক্ষেত্রের অনেকখানি সামনে চলে গিয়েছেন। তাদের লক্ষ্য আরও বেশি ইউক্রেনিয়ান এলাকা দখলে নেওয়া।

হামলা শুরুর পর মার্কিন গোয়েন্দাদের মতো আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সমর বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল, শুরুতেই ইউক্রেনের বিমানবাহিনী ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের চেষ্টা করবে রুশ যুদ্ধবিমানগুলো।

‘দ্য মিস্ট্রিয়াস কেস অব দ্য মিসিং রাশিয়ান এয়ার ফোর্স’ শিরোনামে যুক্তরাজ্যের গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমেই প্রতিপক্ষের বিমানবাহিনী ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করা ‘প্রত্যাশিত একটি পদক্ষেপ’।

১৯৩৮ সাল থেকে প্রায় সব যুদ্ধে এমনটিই দেখা গেছে। তবে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে ইউক্রেনে। যুক্তরাজ্যের গবেষণা প্রতিষ্ঠান জেনসের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া ও ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর শক্তির ফারাক বেশ বড়। রাশিয়ার হাতে ১৩২টি বোমারু বিমান রয়েছে, যেখানে ইউক্রেনের কোনো বোমারু বিমান নেই। রাশিয়ার ৮৩২টি যুদ্ধবিমানের বিপরীতে ইউক্রেনের রয়েছে ৮৬টি।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর পরিবহণ উড়োজাহাজের সংখ্যাও যথাক্রমে ৩৫৮ ও ৬৩। রাশিয়া-ইউক্রেন দুই দেশের বিমানবাহিনীর অন্যান্য অস্ত্রের তুলনামূলক চিত্রটাও অনেকটা একই। তবে ড্রোনের সংখ্যার দিক দিয়ে এগিয়ে রয়েছে ইউক্রেন। দেশটির ৬৬টি ড্রোনের বিপরীতে রাশিয়ার রয়েছে মাত্র ২৫টি। (তথ্যসূত্র: প্রথম আলো) রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির দুজনেরই ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও তাদের অস্তিত্ব নির্ভর করছে এ যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের ওপর।

যদিও ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা গেছে একটি যুদ্ধ শুরু করা যত সহজ তা শেষ করা ততটা সহজ নয়। পরিস্থিতির বিচারে ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আক্রমণ এবং ২০০৩ সালে ইরাকে আক্রমণের সময় ও দীর্ঘসূত্রিতার বিষয় এখানে উল্লেখ্য।

ইউক্রেনের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাতের পর রুশ সামরিক পরিকল্পনা এখন আর হয়ত পরিকল্পনামাফিক এগোচ্ছে না। রাশিয়ার প্রথম আক্রমণকে ‘ততটা চমকপ্রদ নয়’ বলে বর্ণনা করছেন এবং ‘প্রত্যাশার তুলনায় ধীরগতির’ বলে অভিমত দিয়েছেন। এর কয়েকটি কারণ ব্যাখ্যা করেছে রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসের ইন্সটিটিউটের (রুসি) ইউরোপীয় নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এড আর্নল্ড।

এতে তিনি বলেন, সামরিক আক্রমণের নীতি হল, সাধারণত ‘শুরুতেই বিশাল একটা ধাক্কা দেওয়া’।রাশিয়া ইউক্রেন সীমান্তে দেড় লাখ থেকে এক লাখ ৯০ হাজার সৈন্য সমাবেশ করলেও, এখন পর্যন্ত তাদের সবাইকে মাঠে নামায়নি। গত বৃহস্পতিবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সামরিক অভিযান ঘোষণার কয়েক মিনিট পরেই ইউক্রেনে বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে রুশ সেনারা। এরপর থেকে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ চলছে।

ইউক্রেন দাবি করেছে, যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইউক্রেনের দুই হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। যদিও নিহতের নির্দিষ্ট সংখ্যা জানায়নি তারা। এছাড়া রাশিয়ার ৫ হাজার ৪৮০ সৈন্য নিহত হয়েছেন বলে দাবি ইউক্রেনের। যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনে অস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছিল রাশিয়ার হামলা শুরুর আগে থেকেই। এ দলে যোগ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশ। হামলা শুরুর পর জার্মানি ইউক্রেনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ট্যাংক-বিধ্বংসী অস্ত্র দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠানোর জন্য ‘আন্তর্জাতিক দাতা সমন্বয় কেন্দ্র’ এর নামে একটি উদ্যোগ নিয়েছে। এমন কি হামলা ইস্যুতে যারা আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে ছিল, সে দেশগুলোও এখন ইউক্রেনে সাহায্য পাঠাতে শুরু করেছে ।

রাশিয়া গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে প্রতিরোধব্যবস্থা জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক জোট ও ইইউ কৌশলগত ভাবে সক্রিয় রয়েছে। ইইউর ২৭টি দেশের মধ্যে ২১টি দেশই ন্যাটোর সদস্য। এ দেশগুলো নিজ নিজ দায়িত্বে সামরিক সরঞ্জাম পোল্যান্ড হয়ে ইউক্রেন পাঠাচ্ছে। তবে দেশগুলো নিজ নিজ দায়িত্বে সেখানে অস্ত্র পাঠাচ্ছে। ন্যাটোর সদস্য নয় এনং দেশ সুইডেন। তারা পাঁচ হাজার ট্যাংক–বিধ্বংসী অস্ত্র পাঠিয়েছে ইউক্রেনে। পাঁচ কোটি মার্কিন ডলার এবং অন্যান্য অস্ত্রও পাঠিয়েছে দেশটি। একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে ফিনল্যান্ডও। তারা আড়াইহাজার আগ্নেয়াস্ত্র, দেড় লাখ গোলা, দেড় হাজার ট্যাংক-বিধ্বংসী অস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে। ইউক্রেনের সেনারা নিজেদের ভূমি রক্ষা করতে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন।

ক্রেমলিন ও বিভিন্ন দেশের সমর বিশেষজ্ঞদের ধারণার চেয়ে বেশি সময় রুশ সেনাদের অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছেন তারা। যুক্তরাষ্ট্রের সমর বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, ইউক্রেনের সেনারা রুশ সামরিক অগ্রযাত্রা সাময়িক ঠেকাতে পারলেও, দীর্ঘ মেয়াদে এ অর্জন ধরে রাখতে পারবেন না। এর মধ্যে ইউক্রেনের অধিবাসীরা এমন একটি জাতিতে পরিণত হচ্ছেন, যাদের হাতে হাতে অস্ত্র রয়েছে।

এ বিষয়ে ইউরোপে সাবেক শীর্ষ মার্কিন সেনা কমান্ডার ও সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান পলিসি অ্যানালাইসিসের বিশ্লেষক ফ্রেডেরিক বি. হজেস বলেন, ‘যুদ্ধের সময় আপনি যা ভেবেছেন, সব সময় তা না-ও ঘটতে পারে। এক্ষেত্রে যে পক্ষ দ্রুত শিখতে পারবে, আত্মস্থ করতে পারবে, সে জিতবে। ইউক্রেন দ্রুত শিখছে।’ (সূত্র: প্রথম আলো) রুশ বাহিনী ইউক্রেনে এক রহস্যময় যুদ্ধ কৌশল নিয়ে সামনে এগোচ্ছে। ইউক্রেন সেনারা স্থলপথে রুশ অগ্রযাত্রা ঠেকানোর চেষ্টা করছে। দেশে-বিদেশের সমর্থন নিয়ে ইউক্রেনের সেনারা রাজধানী কিয়েভের নিয়ন্ত্রণ এখনো ধরে রেখেছে। শক্তিশালী রুশ বাহিনী অভিযান শুরুর নবম দিনে কিয়েভের উপকণ্ঠে পৌঁছে গেছে। রাশিয়ার বিশাল সেনাবহর ইউক্রেনের সেনারা ছোট ছোট অস্ত্র ব্যবহার করে এখন পর্যন্ত কিয়েভের নিয়ন্ত্রণ ঠেকিয়ে রেখেছে। রাশিয়ার সর্বাত্মক আক্রমণ ঠেকাতে মরিয়া ইউক্রেনের যোদ্ধারা। একটি অনিশ্চিত ও ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে বিশ্ববাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post জেলেনস্কি ‘নিহত হলে’ ইউক্রেন সরকারের ভবিষ্যৎ কী হবে জানালেন ব্লিনঙ্কেন
Next post এবার ইউক্রেনের বিরুদ্ধে নামছে ‘সিরিয়ান যোদ্ধারা’