যুদ্ধে লাভ শুধু যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের?

এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলছে রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের যুদ্ধ। এই যুদ্ধের বিরূপ প্রভাব সারাবিশ্বে পড়ছে বলে বিভিন্ন মহল মনে করছে। ইতিমধ্যে এই যুদ্ধের প্রভাব তেলের বাজারে পড়া শুরু করেছে, যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপ জুড়ে লাখ লাখ শরণার্থী তৈরি হচ্ছে এবং যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী হলে ইউরোপ এই চাপ সামলাতে পারবে না।

যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হবে ততো ইউরোপের ওপর চাপ পড়বে। এই যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষগুলোর মধ্যে অবশ্যই রাশা এবং ইউক্রেন প্রধান। রাশা যতই আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করুক না কেন, এই যুদ্ধের ধকল দেশটির ওপর তীব্রভাবে পড়বে।

ইতিমধ্যে দেশটিতে দেখা যাবে অর্থনৈতিক মন্দা এবং সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রেক্ষিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে রাশিয়ার জনগোষ্ঠীর ওপর।

ইউক্রেন এই যুদ্ধে ইতোমধ্যে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। ইউক্রেনের মানুষরা অনিশ্চিত এক অন্ধকার গহ্বরের দিকে ক্রমশ যেন তলিয়ে যাচ্ছে। তাদের বেশকিছু মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে এখন শরণার্থী, প্রচুর মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে।

যুদ্ধ কখনোই স্বস্তি দেয়না, যুদ্ধ কখনোই কোনোকিছু অর্জন করায় না। যুদ্ধ শুধু ক্ষতি শেখায়। এই দুটি দেশ তাঁর সর্বশেষ উদাহরণ। কিন্তু এই যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অন্যান্য দেশগুলো।

এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বে নতুন করে অর্থনৈতিক মন্দার শঙ্কা দেখা দিয়েছে, এই যুদ্ধের ফলে তৃতীয় ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলটি হলো গোটা ইউরোপ। গোটা ইউরোপ জুড়ে আস্তে আস্তে ইউক্রেনের শরণার্থীরা ছড়িয়ে পড়ছে, এই চাপ সামলানো তাদের জন্য এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করবে। যদি রাশিয়া গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয় তাহলে ইউরোপ আরেকটা বিপর্যয়ে পড়বে।

এই যুদ্ধের ফলে গোটা ইউরোপ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেই অনেকে ধারণা করছে। এই যুদ্ধে যে সমস্ত দেশগুলো রাশিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সম্পর্ক রেখেছে বা যে সমস্ত দেশগুলো মৌনব্রত পালন করছে তারাও বড় ধরনের চাপে পড়তে যাচ্ছে।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশও চাপ অনুভব করছে। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমে অর্থ লেনদেন একটা বড় ধরনের সমস্যা হিসেবে বাংলাদেশের সামনে এসেছে।

যুদ্ধ যতো দীর্ঘস্থায়ী হবে ততো সমস্যাগুলো বাড়তেই থাকবে। তবে এই যুদ্ধে সবাই যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এমনটি নয়। দুটি দেশ সুস্পষ্টভাবে এই যুদ্ধে লাভবান হচ্ছে। কে বেশি লাভবান হচ্ছে সেটি নিরীক্ষার বিষয়। এ দুটি দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে সবচেয়ে লাভবান হচ্ছে বলে অনেকেই মনে করেন। বিশেষ করে জো বাইডেনের তলানির জনপ্রিয়তা এই যুদ্ধের ফলে কিছুটা হলেও রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

জো বাইডেন দায়িত্ব গ্রহণের পর আস্তে আস্তে তার জনপ্রিয়তা নিম্নমুখী হয়ে পড়েছিল। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই যুদ্ধ মধ্যবর্তী নির্বাচনে জো বাইডেন এবং ডেমোক্রেটদের কিছুটা হলেও স্বস্তি দিতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।

এই যুদ্ধের ফলে ইউরোপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কব্জায় চলে আসবে, যেটি হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। ইউরোপে অভাব, অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেবে, শরণার্থীদের চাপ তাঁর মোকাবিলা করতে পারবে না, এমনকি সামরিক দিক থেকেও তারা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং রাশিয়ার আগ্রাসন ঠেকানোর মত সামর্থ্য তাদের পুরোপুরি নেই।

এই বাস্তবতায় তারা পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে মনে যেন এটিই চেয়েছিল। এই যুদ্ধে চীনেরও লাভ হবে।

এই যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে চীনের বলয় এবং পরিধি বাড়তে পারে।

নব্বইয়ের দশকের পর আবার যে বিশ্ব মেরুকরণ, সেই মেরুকরণের একাংশের নেতৃত্ব চীন যে পেতে যাচ্ছে তা নিয়ে কোন সন্দেহ নাই। তাছাড়া এই যুদ্ধ থেকে নিরাপদ দূরত্বে রেখে চীন তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আরো বাড়াবে।

এর ফলে অর্থনৈতিক দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তারা বহু পিছনে ফেলবে। সুইফট নিষেধাজ্ঞাসহ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে চীনের মুদ্রা মান বাড়বে এবং অনেক দেশই বিকল্প হিসেবে ডলারের বিপরীতে চীনা মুদ্রা ব্যবহার করতে শুরু করবে।

ফলে চীন অর্থনৈতিকভাবে সবার চেয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে যাবে এবং বিভক্ত একটি বিশ্বের নেতৃত্ব দিবে। কাজেই এই যুদ্ধে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের যে আপাত লাভ, সেই লাভের ফলে বিশ্বে নতুন মেরুকরণ হবে। সেই মেরুকরণের নেতৃত্ব কার কাছে যাবে সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post কারা আসছে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে?
Next post রাশিয়া ইস্যুতে বিভ্রান্ত বিএনপি