নতুন মোড়কে হারিছ চৌধুরীর মৃত্যু

হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর রহস্য নিয়ে নতুন আরেকটি গল্প মঞ্চস্থ হয়েছে। একটি গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে মাহমুদুর রহমান পরিচয়ে মৃত ব্যক্তিই হারিছ চৌধুরী।

ফলে এ নিয়ে আবার নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। মৃত্যু নিয়ে একের পর এক বিভ্রান্তিকর এবং অসামঞ্জস্য তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। হারিছ চৌধুরীর মৃত্যু নিয়ে প্রথম তার ভাই সিলেট বিএনপির সহ-সভাপতি দাবি করেছেন যে, হারিছ চৌধুরী লন্ডনে মারা গেছেন।

কিন্তু তার এই বক্তব্যের কোন সত্যতা পাওয়া যায়নি। এরপর হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর খবর জানান যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি মালেক। তিনি এক অবিশ্বাস্য দাবি করে জানান, হারিছ চৌধুরী কখনোই বাংলাদেশ থেকে বের হননি।

এরপর হারিছ চৌধুরীর কন্যা ব্যারিস্টার সামিরা আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তাঁর পিতা হারিছ চৌধুরী ঢাকায় মারা গেছেন। তার এই কথা কেউ কেউ বিশ্বাস করলেও এখন তা আর বিশ্বাসযোগ্য নয়।

কারণ, মৃত্যু নিয়ে একের পর এক বিভ্রান্তিকর এবং অসামঞ্জস্য তথ্যের ফলে অনেকেই মনে করছেন যে, ইন্টারপোলের রেড এলার্ট থেকে নিস্তার পেতে এবং গোয়েন্দাদের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতেই এই মৃত্যুর খবর প্রচার করা হচ্ছে।

এদিকে ওই গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী মাহমুদুর রহমান নাম নিয়ে দীর্ঘ ১৪ বছর গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। তিনি ভারত কিংবা লন্ডনেও যাননি।

বাংলাদেশের ভেতরেই ছিলেন এবং ঢাকাতেই বেশিরভাগ সময় কাটান। ওয়ান ইলেভেনের পরপরই কিছুদিন সিলেটে অবস্থান করেন এবং সেখান থেকে ঢাকায় এসে নাম বদল করে মাহমুদুর রহমান রাখেন।

দীর্ঘ ১৪ বছর একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক পরিচয়ে ঢাকার পান্থপথে প্রায় ১১ বছর কাটান। এই সময় তিনি মাহমুদুর রহমান নামে এই নম্বরের BW0952982 একটি পাসপোর্টও নেন। সেখানে দেখা যায়, ২০১৮ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে এই পাসপোর্ট ইস্যু হয়।

শুধু পাসপোর্ট নয়, জাতীয় পরিচয় পত্রও পাওয়া যায় মাহমুদুর রহমান নামে। তার এনআইডি নম্বর হচ্ছে ১৯৫৮৩৩৯৫০৭। পাসপোর্ট ও এনআইডি‘র সূত্র ধরে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানই আলোচিত বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী।

ওই গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেয়া ছবি অনুযায়ী দেখা যায়, পাসপোর্টে দেয়া ছবির ব্যক্তিটির চেহারার সঙ্গে হারিছ চৌধুরীর চেহারার অমিল রয়েছে। তার চেহারায় এসেছে অনেক পরিবর্তন। সাদা লম্বা দাড়ি।

চুলের রঙ একদম সাদা। বয়সের ছাপ পড়েছে। ওই এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের ম্যানেজারের বক্তব্যে জানানো হয়, ওই ব্যক্তির স্ত্রী ও সন্তানরা থাকেন লন্ডনে। কেউ কোন দিন আসেনি। তাকে সবাই প্রফেসর সাহেব বলেই জানতো।

একদিন ভোর রাতে কেউ একজন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। শুনেছি হাসপাতালে থাকার পর তার মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর পর তার মেয়েকে দেখি। প্রথমে আমাদেরকে জানাতেও চাননি স্যার মারা গেছেন।

মারা যাবার পর দুই মাস এই বাড়িতেই ছিলেন জামাইসহ। গত জানুয়ারিতে তারা বাসা ছেড়ে দেন। সেখানে ওই বাসার সামনে থাকা একটি ফার্মেসী এবং মুদি দোকানের মালিকের বক্তব্যও দেয়া হয়।

হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মাহমুদুর রহমান নামেই হাসপাতালে ভর্তি হন। দাফনও হয় এই নামে। গত বছর ২৬শে আগস্ট করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। এর আগে অন্য একটি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

মারা যান ৩রা সেপ্টেম্বর। ডেথ সার্টিফিকেটে বলা হয়েছে তিনি Covid with Septic Shock এ মারা গেছেন। তিনি প্রফেসর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মাহবুব নূরের অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ৪ সেপ্টেম্বর সার্টিফিকেট ইস্যু করেন ওই চিকিৎসক।

তার মৃতদেহ গ্রহণ করেন মেয়ে সামিরা চৌধুরী। এরপর একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে গোসলের জন্য মোহাম্মদপুর নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর আত্মীয়স্বজনের পরামর্শে সাভারে দাফনের সিদ্ধান্ত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, হারিছ চৌধুরীর মৃত্যু খবর জানিয়ে তার মেয়ে সামিরার দেয়া বক্তব্য কোনটা সত্য? প্রথমে তার মেয়ে সামিরা চৌধুরী বলেন যে, তার বাবা হারিছ চৌধুরী বাংলাদেশেই মারা গেছেন।

দাফন করা হয়েছে ঢাকার বাইরে। ঢাকা থেকে অনেক দূরে। যেখানে যেতে এক-দেড় ঘণ্টা গাড়ি চালাতে হয়। ওই প্রতিবেদনে এখন আবার সামিরা চৌধুরী বলেন, ১৪ বছর যে মানুষটি আত্মগোপনে ছিলেন তার খবর প্রকাশ করা সহজ ছিল না।

নানা ভয় আর আতঙ্ক কাজ করেছে। তবে এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানই আমার বাবা হারিছ চৌধুরী। সুইজারল্যান্ডে অবস্থানরত আমার ভাই নায়েম শাফি চৌধুরীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা বলছে যে, হারিছ চৌধুরীর ঢাকা থাকার কথাটি অবাস্তব, ভিত্তিহীন এবং অলৌকিক। এটি অসম্ভব ব্যাপার। গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন যে, হারিছ চৌধুরী বাংলাদেশে মারা যাননি।

তাঁরা বলেন যে, আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি এতো দুর্বল নয় যে হারিছ চৌধুরী ঢাকায় থাকবেন এবং হাসপাতালে চিকিৎসা নিবেন, অথচ তার কোনো খবর পাওয়া যাবে না। এটি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এখন যদি হারিছ চৌধুরী বাংলাদেশে থাকেও তাহলে যাদের গুম, খুনের দাবি করা হচ্ছে তারাও এমন আত্মগোপনে আছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে এখন নিজেদের ফাঁদেই নিজেরা পা দিয়েছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুকে অন্যখাতে প্রবাহিত করার জন্য মাহমুদুর রহমান পরিচয়ে আত্মগোপনে থাকার এক নতুন নাটক সাজানো হয়েছে।

ইন্টারপোলের রেড এলার্টসহ তার বিরুদ্ধে হওয়া বিভিন্ন মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই হারিছ চৌধুরী মারা গেছে এটিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই এই মৃত্যুর নাটক সাজানো হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

কিন্তু একটি মানুষ মারা গেলে তার ডেথ সার্টিফিকেট লাগে। ডেথ সার্টিফিকেট ছাড়া তাঁর সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা, তাঁর ব্যাংক হিসেব ইত্যাদি কোনকিছুই নিষ্পন্ন করা সম্ভব হবে না।

হারিছ চৌধুরী যে উত্তরাধিকার আছে তাদের কি হবে? অন্যদিকে, ইন্টারপোলের রেড এলার্ট থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যও হারিছ চৌধুরীর নামে ডেথ সার্টিফিকেট লাগবে। ফলে, এখন নিজেদের তৈরি করা ফাঁদেই নিজেরা পা দিয়ে বরং আরও সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন এবং এটাও স্পষ্ট হয় যে হারিছ চৌধুরী আসলে মার যাননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post যুদ্ধে লাভ শুধু যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের?
Next post জাতীয় সরকারের দাবি কার স্বার্থে