বিলুপ্তির পথে হেফাজত?

ধর্ম ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম এখন অনেকটাই অভিভাবকশূণ্য, দিশাহীন। একদিকে, সংগঠনটির সিনিয়র নেতাদের একের পর এক মৃত্যু। অন্যদিকে মামুনুল হকসহ কেন্দ্রীয় নেতারা জেলে।

এর পাশাপাশি ইসলামী আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার অভিযোগে শীর্ষ নেতাদের দলত্যাগ। সব মিলে একপ্রকার অস্তিত্বহীনতায় ভুগছে এই সংগঠনটি।

কিছুদিন আগে রাজনীতি না করার শর্তে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের কাছে কেন্দ্রীয় নেতাদের জামিন চেয়েছিল হেফাজত নেতারা। তবে এতো সহজে বিশ্বাস করার মতো কোনো দৃষ্টান্ত বা নজির হেফাজতে ইসলাম এখনও স্থাপন করতে পারেনি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, সিনিয়র নেতাদের মৃত্যু, গ্রেফতার এবং জনপ্রিয় নেতাদের পদত্যাগের ফলে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে দুর্বল অবস্থানে থাকলেও সংগঠনটি ভেতরে ভেতরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর আশংকা অমূলক নয়।

কদিন আগেও কওমি মাদরাসা ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতের ঘোষিত যেকোনো কর্মসূচিতে সারাদেশে কিছু সময়ের জন্য হলেও একটা সংকট তৈরি করতো।

আট বছর আগে ঢাকায় শাপলা চত্বরে উত্থান হওয়া হেফাজতের তাণ্ডবে দেশে সাময়িক অচলাবস্থা সৃষ্টি হতো। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য, মোদি বিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন দাবিতে সরকারের নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল হেফাজত। বিশেষ করে হেফাজতের আমির আহমেদ শফির মৃত্যুর পর প্রয়াত জুনায়েদ বাবুনগরী যখন আমির হয়েছিলেন তখন হেফাজত সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল।

এসবের মধ্যে ধর্ম অবমাননার জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান করে আইন করা, নারীদের পোশাকে বিশেষ করে হিজাব উদ্বুদ্ধ করা, নারী নীতি ও শিক্ষা নীতির কথিত ইসলাম বিরোধী ধারাগুলো বাদ দেয়া, উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ইসলামি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, ভাস্কর্য বা মঙ্গল প্রদীপের মতো বিষয়গুলোর বিরোধিতা, নাটক সিনেমায় ধর্মীয় লেবাসের লোকজনের নেতিবাচক চরিত্র বন্ধ কিংবা কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার দাবির মতো বিষয়গুলো রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা সময়ে আলোচনা সমালোচনার ঝড় তুলেছে।

বিশেষ করে ভাষ্কর্য ইস্যুতে বেশ সরব দেখা গিয়েছিল হেফাজত নেতাদের। এরপর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সারা দেশে তাণ্ডব চালায় হেফাজত। এর পাশাপাশি বিভিন্ন সময় হেফাজত নেতারা যেরকম উষ্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন, তাতে সরকারের উদ্বিগ্ন হবার যথেষ্ট কারণ ছিল।

কিন্তু সেই হেফাজত এখন আর নেই। বর্তমান হেফাজত স্পষ্টতই এখন মিনমিনিয়ে কথা বলছে এবং হেফাজতের কথাবার্তার মধ্যে আগের সেই হুংকার তো নেই-ই, বরং আপন প্রাণ নিয়ে বাঁচবার উপক্রম দলটির নেতাদের। বিশেষ করে হেফাজতের সাবেক যুগ্ম-মহাসচিব মামুনুল হকের নারী কেলেংঙ্কারিতে সংগঠনটির নেতাদের বিরুদ্ধে নীতি-নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠে।

এছাড়া মামুনুল হকের বিরুদ্ধে ছেলে বলাৎকারের অভিযোগও উঠে। পাশাপাশি হেফাজতে ইসলামের আদর্শ বিচ্যুত হয়েছে, মওদুদীর সালাফিবাদের চর্চা করছে এবং দেশের শান্তি শৃঙ্খলা এবং স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে- এমন সব অভিযোগ তুলে হেফাজতের নায়েবে আমীর মাওলানা আবদুল্লাহ মোহাম্মাদ হাসান সহ অনেকেই গণহারে পদত্যাগ করেছিলেন।

জুনায়েদ বাবুনগরী হেফাজতের আমির থাকা অবস্থাতেই হেফাজতের বেশ কয়েকজন নেতা যারা সরাসরি যুদ্ধঅপারাধী এবং স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তির সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে সরকার। আর সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হয় মামুনুল হকসহ বেশ কয়েকজন হেফাজত নেতাকে। এর পর পরই অনেকখানি দমে যায় হেফাজত।

কিছু দিন আগে সংগঠনটির মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমানের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে দেখা করেন।

ওই বৈঠকে হেফাজত নেতারা সংগঠন ও পরিবারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন যে, বন্দি নেতাদের মুক্তি দেওয়া হলে তারা কওমি মাদ্রাসায় কোনো ধরনের রাজনীতিতে জড়াবে না। তবে সরকার তাদের আবেদনে সাড়া দেয়নি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হেফাজত নেতাদের জানিয়ে দেন, এ বিষয়ে যা হবে আদালতের মাধ্যমেই করতে হবে।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার এক বছর পর অর্থাৎ ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি আত্মপ্রকাশ হয় কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের। এর প্রতিষ্ঠাতা আমীর ছিলেন প্রবীণ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব শাহ আহমদ শফী এবং মহাসচিব ছিলেন জুনায়েদ বাবুনগরী।

২০১১ সালে সরকার ‘নারী উন্নয়ন নীতিমালা’ ঘোষণা করলে হেফাজতে ইসলাম প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা শুরু করে। তবে ২০১৩ সালে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরু হলে হেফাজতে ইসলাম রাজনৈতিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তবে বর্তমানে তাদের কথা না সরকার, না জনগণ, কেউই শুনছে না।

তাদের অধিকাংশ নেতা এখনো কারাগারে। সরকারের কৌশলের কারণে দেশের আলেম সমাজও হেফাজতের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে আলেম সমাজ প্রকাশ্যে হেফাজতের নেতাদের বিরুদ্ধে কথা বলছেন।

এটি হেফাজতের জন্য অস্বস্তিকর এবং একই সঙ্গে বিব্রতকরও বটে। অনেকেই বলছেন, হেফাজত যে প্রকৃত ইসলাম না, এটি প্রতিষ্ঠা করে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে সরকারের। আর এর কারণেই এখন হেফাজতের ব্যাপারে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের আর আবেগ অনুভূতি কাজ করছে না। আর এই সরকারের কৌশলের কারণেই সংগঠন হিসেবে লণ্ডভণ্ড এবং হেফাজত অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই।

তবে সংগঠনটির ভবিষ্যৎ যাই হোক গত কয়েক বছরে এ সংগঠনটির কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ডের জের ধরে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে যা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে যেমন প্রভাবিত করেছে, তেমনি প্রভাবিত করছে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজজীবনকেও।

বাংলা ইনসাইডার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post বিএনপির নেতৃত্ব ছাড়তেই হচ্ছে তারেককে
Next post তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তিন বিকল্প নিয়ে ভাবছে বিএনপি