শরণার্থীদের স্বাগত জানাচ্ছে সাধারণ জার্মানরা

জার্মানির রাজধানী বার্লিনের কেন্দ্রীয় রেলস্টেশনে পূর্ব দিক থেকে আসা ট্রেনগুলোতে ইউক্রেনের হাজার হাজার নারী, পুরুষ ও শিশু শরণার্থী হয়ে আসছে প্রতিদিন। ইউক্রেনে রাশিয়ার সেনা অভিযান থেকে বাঁচতে তাদের এই যাত্রা।

জার্মানি আসার পর ইউরোপের অন্য জায়গাগুলোর উদ্দেশ্যে যেতে ইচ্ছুক শরণার্থীদের টিকেট দেওয়া হচ্ছে। আবার যাদের যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই তাদের বিশেষ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

শরণার্থীদের স্বাগত জানাতে বিশাল আয়োজন করা হয়েছে। তাদের সাহায্যের জন্য মোবাইল ফোনের সিমকার্ড সরবরাহের পাশাপাশি চিকিৎসকদল, অনুবাদক/ দোভাষী, স্বেচ্ছাসেবক ও সংগঠকের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বড় জটলার মধ্যে অনেকগুলো জার্মান পরিবারকেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় শরণার্থীদের গ্রহণ করতে। তাদের আশ্রয় দিতে নিজের বাড়ির কক্ষ ছেড়ে দিতে চান তারা। অনেকে মাথার ওপর তুলে ধরা কার্ডবোর্ডে বা কাগজে লিখে রেখেছেন বাড়িতে কতদিনের জন্য কয়জনকে জায়গা দিতে পারবেন। একটি কাগজে লেখা ‘দুজনকে জায়গা দেওয়া যাবে। স্বল্প বা দীর্ঘ সময়ের জন্য। ’ আরেকজনের হাতের কাগজে লেখা, ‘বড় কক্ষ, এক থেকে তিনজনের জন্য। শিশুও স্বাগত। যতদিন ইচ্ছা থাকবেন। ’

এক ব্যক্তি ছোট মাইকে জিজ্ঞেস করছিলেন, কেউ কি আছেন, ১৩ জনের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে পারবেন? শুনে একজন এগিয়ে গেলেন। বছর বারোর মেয়েকে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এক নারী। তার হাতের কাগজে লেখা, ‘মা আর দুই শিশুর জন্য জায়গা হবে চার থেকে ছয় সপ্তাহের জন্য। ’ ৭০ বছরের মার্গট বালডুফ নীল ও হলুদ রঙের একটি বোর্ডে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, ‘সন্তানসহ একজন মায়ের জন্য একটি কক্ষ হবে। ’

মার্গট বলেন, ‘আমিও কমবেশি শরণার্থীর সন্তান। মা আমাকে নিয়ে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেকারণে আমি শরণার্থীদের জন্য কিছু করতে বাধ্যবাধকতা অনুভব করি। ’ তিনি আরো বলেন, এটি হিটলারের সময় নয়, কিন্তু মনে হচ্ছে পুতিন যা করছেন তা হিটলার আগে যা করেছিলেন তার মতোই।

বার্লিনের শহরতলীর বাসিন্দা মাটিনা ওয়ারডাকাস ও তার স্বামী টিমো কহলরি তাদের বাড়ি খুলে দিয়েছেন। তারা চার ইউক্রেনীয়কে জায়গা দিচ্ছেন। এরা হলেন আনাস্তাসিয়া, তার চার বছরের ছেলে আরতেমি এবং তার শ্বশুর-শাশুড়ি ভিক্টোরিয়া ও ভ্লাদিমির। কিন্তু আনাস্তাসিয়ার স্বামী দিমিত্রিকে ইউক্রেন ছাড়তে দেওয়া হয়নি। যুদ্ধ করার মতো বয়সের কোনো পুরুষকে ইউক্রেন ছাড়তে দেওয়া হচ্ছে না। বিষয়টি তিনি তাঁর চার বছরের সন্তানকে বোঝাতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘ও সব সময় বাবার কথা জিজ্ঞেস করছে। ’ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করছে, তার বাবা কোথায় এবং কখন তাকে দেখা যাবে। ’ আনাস্তাসিয়া ভেজা চোখে বলছিলেন, ‘আমি এর উত্তর জানি না। তবে আশা করি শিগগিরই। ’ আনাস্তাসিয়া বললেন, ‘আশা করি, আমার বাবাকেও দেখব শিগগিরই। ’ উল্লেখ্য, তার বাবাও ইউক্রেন থেকে পালিয়ে জার্মানি যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

ইউক্রেনে এসেও পরিবারটি যুদ্ধ এড়াতে পারছে না। তাদের খারখিভের বন্ধুরা ভিডিওবার্তায় রাশিয়ার বোমায় বিধ্বস্ত বাড়ির ছবি পাঠিয়েছে। সেখান থেকে কয়েক দিন আগেই তারা পালিয়েছেন।

ইউক্রেন থেকে আসা শরণার্থীদের জায়গা দিতে মাটিনা ও টিমো তাদের ১৩ বছর বয়সী যমজ সন্তান জুনা ও জলির ঘরে চলে গেছেন। জার্মানির একটি আইটি কম্পানির কর্মী টিমো বলেন, ‘যুদ্ধের খবর শুনেই আমরা কাউকে আশ্রয় দেওয়ার কথা ভেবেছিলাম। কারণ এই অবস্থা আমাদেরও হতে পারতো। এটাই আমাদের অনুভূতি। ’

ভ্লাদিমির পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণ জার্মানির অনেক বাসিন্দাদের নাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ তারা বরাবর মনে করে এসেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইউরোপ শান্তির যুগে চলে এসেছে। মাটিনা বলেন, ‘আমরা সারা জীবন শান্তিতে বসবাস করেছি। আমরা জানি না যুদ্ধের মধ্যে থাকার অর্থ কী? আমাদের প্রথম ভাবনা ছিল, আমাদের কাউকে সাহায্য করা দরকার যাতে তারা নিরাপদ বোধ করে। আমরা তাদের অন্তত কিছুটা শান্তি দেব, এই বাড়িতে। ’ সূত্র: বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post যেখানে বাধা আসবে, সেখানেই লড়াই হবে। কারাফটক ভেঙে রাজবন্দিদের মুক্ত করবো: ইশরাক
Next post যারা ভারতবিরোধী-হিন্দুবিরোধী শ্লোগান দেয় তারাই সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ায়