স্বামীর পায়ে হেঁটে এগিয়ে চলা জীবন

সোহেল ও রওশনের পরিচয় পর্বটা বেশ নাটকীয়। কৌতূহল থেকে টাকার নোটে থাকা মুঠোফোনে ফোন দেন সোহেল। অন্য প্রান্ত থেকে কথা বলেন রওশন। ঘটনাটি ২০০৭ সালের শুরুর দিকের।

দুজনের মধ্যে সম্পর্ক হয়। দুজনের পরিবার প্রথমে বিষয়টি মেনে নেয়নি। ওই বছরই দুজন বিয়ে করেন। তবে দুজনের পথচলা সহজ ছিল না। কারণ ময়মনসিংহের ত্রিশালের মেয়ে রওশন আক্তারের জন্ম থেকেই দুই পা অকেজো। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সোহেল মিয়া আট ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট। ছোটবেলায় হারিয়েছেন মা-বাবাকে। ভাই-বোনের কাছে থেকে করেছেন পড়াশোনা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ভালো চাকরি নেন। তিনি জানান, একদিন বিকেলে অফিস ছুটির সময় তাঁর টেবিলের ড্রয়ারে থাকা ১০ টাকার নোটে একটি মুঠোফোন নম্বর লেখা পান। সেই নম্বরের সূত্র ধরে রওশনের সঙ্গে প্রথম পরিচয়। আস্তে আস্তে সেটি গড়ায় প্রেমের সম্পর্কে। বিয়ের পর থেকেই স্বামীর পিঠে উঠে চলাফেরা করছেন রওশন।

সোহেল জানান, পরিবারের আপত্তির মুখেই রওশন বিয়ে করেন। স্ত্রীকে নিয়ে প্রথমে নিজ বাড়িতে উঠতে চাইলেও পরিবারের অন্য সদস্যদের আপত্তির কারণে যেতে পারেননি। চাকরি করলে স্ত্রীকে দেখাশোনার কেউ থাকে না। তাই বেছে নেন ব্যবসা। এক পর্যায়ে সচ্ছল জীবন ছেড়ে অভাবের সংসার মেনে নিয়েছেন স্ত্রীর পাশে থাকতে। ভালোবাসা যেখানে অভাব-অনটন দেখে পালায়, সেখানে অভাবকে ভালোবাসা দিয়ে বরণ করে নিয়েছেন তাঁরা। ত্রিশালের গুজিয়াম টানপাড়া গ্রামে ছোট্ট মাটির ঘর আর একটি টং দোকানই সম্বল এই দম্পতির। তাঁদের সংসারে আছে এক মেয়ে।

রওশন আক্তার বলেন, ‘আমি যেহেতু প্রতিবন্ধী তাই আমার পরিবার থেকেও এ বিয়েতে সম্মতি ছিল না। তখন সবাই বলাবলি করেছে, বিয়ের পর সে আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু আমার একটাই আত্মবিশ্বাস, আমি যে ছেলেটাকে ভালোবাসব সে-ও আমাকে ভালোবাসবে। এই বিশ্বাসটাই আমি সোহেলের ওপর করতে পেরেছিলাম। সে জন্য সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে তার হাত ধরে আমি পালিয়ে যাই এবং বিয়ে করি। এরপর আমাদের মেয়েসন্তান জন্মগ্রহণ করায় আমাদের ভালোবাসা যেন আরো বেড়ে গেছে। ’

রওশন বলেন, ‘কখনো কোথাও যেতে চাইলে আমি শুধু বলি আর সে (সোহেল) তার পিঠে আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়া-আসা করে। আমার মন ভরিয়ে রাখতে সে তার সাধ্যমতো চেষ্টা করে। তাকে আমি ধন-সম্পদ কিছুই দিতে পারিনি, শুধু ভালোবাসাটুকুই দিয়েছি। আর সে আমার ভালোবাসা নিয়েই এখনো আমার সঙ্গে আছে। আমরা সুখেই আছি। ’

সোহেল মিয়া বলেন, ‘আমাদের ভালোবাসাটা অন্য রকম। শারীরিক প্রতিবন্ধী মেয়েকে যেভাবে অন্ধের মতো ভালোবেসেছি, তার মধ্যেও ছিল তেমনি অন্ধ প্রেম। এমন প্রেম এখন আর দেখা যায় না। আমাদের প্রেম পবিত্র, সৃষ্টিকর্তার তরফ থেকে পাওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে ভাষা সৈনিক জালাল উদ্দিনের সন্তানদের
Next post মাদকদ্রব্য প্রবেশ রোধে সীমান্ত এলাকায় চালু হবে অত্যাধুনিক সেন্সর ব্যবস্থা