বাংলাদেশে কে নিকৃষ্ট সিইসি?

আলোচিত-সমালোচিত প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদা বিদায় নিলেন আজ। নুরুল হুদাকে বলা হচ্ছে বিতর্কিত নির্বাচন কমিশনার। অনেকে বলতেন যে, নুরুল হুদা বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছেন। কেউ কেউ এটাও বলার চেষ্টা করছেন, তিনি বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের ইতিহাসে সম্ভবত নিকৃষ্টতম প্রধান নির্বাচন কমিশনার।

কিন্তু আসলে কি তাই? নুরুল হুদা কি বাংলাদেশের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম নির্বাচন কমিশনার নাকি তার চেয়েও খারাপ নির্বাচন কমিশনার রয়েছে? স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ১২ জন। এদের মধ্যে দুই একজন ছাড়া সবাই কমবেশি নানারকম কলঙ্কিত অধ্যায় রচনা করেছেন।

আর সেই হিসেবটা যদি আমরা করতে চাই তাহলে দেখা যাবে যে, নুরুল হুদা নয় বরং নিকৃষ্টতম প্রধান নির্বাচন কমিশনার খুঁজতে আমাদেরকে আরও গবেষণা করতে হবে। বাংলাদেশের প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন বিচারপতি এম ইদ্রিস। তিনি ৭ জুলাই, ১৯৭২ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৭৭ সালের ৭ জুলাই পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

এরপর প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আসেন বিচারপতি কে এম নুরুল ইসলাম। তিনি ৮ জুলাই, ১৯৭৭ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বেই জিয়াউর রহমানের সেই প্রহসনের হ্যাঁ না ভোট অনুষ্ঠিত হয় যেখানে ৯৯ ভাগ হ্যাঁ ভোট পড়েছিল এবং জাতির একটি সেরা তামাশায় পরিণত হয়েছিল। বিচারপতি কে এম নুরুল ইসলাম কি হুদার চেয়ে ভালো নির্বাচন কমিশনার ছিলেন?

এই কে এম নুরুল ইসলামের নেতৃত্বেই জিয়াউর রহমানের ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল যে সংসদ নির্বাচনটি ছিল পাতানো এবং ভুয়া। এই নির্বাচনেও জনগণের রায়ের কোন প্রতিফলন ঘটেনি।

বাংলাদেশের তৃতীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন বিচারপতি চৌধুরী এটিএম মাসুদ। তিনি ১৭ মে ১৯৮৫ সালে থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

তাঁর নেতৃত্বে মিডিয়া ক্যু এর ১৯৮৬ সালের ৭ মের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল যে নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন কোন ফলাফল ঘোষণা করেনি, ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছিল বেতার টেলিভিশন এর মাধ্যমে।

এরপর বিচারপতি সুলতান হোসেন খান ১৭ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯০ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে তার সংক্ষিপ্ততম নির্বাচনী অধ্যায় শেষ হয়ে যায়, তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে কোন বড় নির্বাচন করেননি।

এরপর দেশের পঞ্চম প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন বিচারপতি আব্দুর রউফ। তিনি ২৫ ডিসেম্বর অর্থাৎ স্বৈরাচারের পতনের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৯৫ সালের ১৮ এপ্রিল বিদায় নেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি মোটামুটি নিরপেক্ষ ছিলেন বলে বলা হয় কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারে তাঁর আমলে মাগুরা, মিরপুরে কলঙ্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠিত হয় এবং বিচারপতি আব্দুর রউফ শুধুমাত্র তামাশা দেখেন। এমনকি মাগুরা নির্বাচনে তার চোখের সামনে কারচুপি হওয়ার পরেও তিনি পালিয়ে ঢাকায় চলে এসেছিলেন।

বাংলাদেশের আরেকটি নিকৃষ্টতম নির্বাচন কমিশন পাই আমরা ১৯৯৫ সালের ২৭ এপ্রিল বিচারপতি কেএম সাদেকের। সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ এবং কৌতুকপূর্ণ নির্বাচনটি করেছিলেন বিচারপতি এ কে এম সাদেক। তিনি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এক হাস্যকর নির্বাচন করেন, যেখানে বাংলাদেশের জনগণের কেউই ভোট দেননি।

কিন্তু নির্বাচনের একটি ফলাফল ঘোষিত হয়েছে। তীব্র গণআন্দোলনের মুখে এ.কে.এম সাদেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার থেকে সরে যেতে বাধ্য হন এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করেন, যেখানে মো. আবু হেনা প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আবু হেনাই সম্ভবত বাংলাদেশের একমাত্র প্রধান নির্বাচন কমিশনার যিনি কোনো রকম বিতর্ক ছাড়াই তার মেয়াদ শেষ করেছিলেন, সম্মান এবং শ্রদ্ধা নিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর প্রধান নির্বাচন কমিশনার দায়িত্ব নেন এম এ সাঈদ। তিনি যে পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন তার নির্বাচন সেটি প্রমাণ করে যদিও ২০০১ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পরও সেই নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল। এরপর বিচারপতি এমএ আজিজ হন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।

তিনি ২০০৫ সালের ২৩শে মে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২১শে জানুয়ারি ২০০৭ সালে দায়িত্ব ছেড়ে দেন। তিনি নির্বাচন কমিশনে একটি ভাড়ের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন এবং তিনি যতটা নির্বাচন কমিশনার হিসেবে পরিচিত, তারচেয়ে একজন কৌতুক অভিনেতা হিসেবে বেশি পরিচিত ছিলেন।

বাংলাদেশের ১০ প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন এটিএম শামসুল হুদা। তিনি মোটামুটি নিরপেক্ষ নির্বাচন করেছিলেন কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাঁর কিছু কিছু ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।

এরপর কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার হয়েছিলেন। তিনি নির্বাচন কমিশনার হিসেবে কতটা নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে পেরেছেন, সেটি যেমন প্রশ্নবিদ্ধ কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে তিনি একজন ব্যক্তিত্ববান মানুষের ইমেজ নিয়ে গেছেন।

আর সর্বশেষ কে এম নুরুল হুদা। তাহলে আমরা বিচারপতি কে এম নুরুল ইসলাম, বিচারপতি চৌধুরী এটিএম মাসুদ কিংবা বিচারপতি সাদেকের চেয়ে কি নুরুল হুদাকে খারাপ নির্বাচন কমিশনার হিসেবে চিহ্নিত করবো? এই সমস্ত নির্বাচন কমিশনের আমলে বাংলাদেশের যে ভোট ব্যবস্থাকে তামাশায় পরিণত করা হয়েছিল নুরুল হুদা কি তাদের চেয়েও খারাপ ছিলেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post হিজাব পরে ঢুকতে বাধা, কর্ণাটকে পরীক্ষা দিল না দুই শিক্ষার্থী
Next post রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি: নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্র?