বিচারপতি শাহাবুদ্দিন: কি পরিচয়ে থাকবেন?

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ৯২ বছর বয়সী সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ। গত রাতে তিনি সিএমএইচে ভর্তি হয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন ধূমকেতুর মতো।

তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচনায় এসেছিলেন এক সংকটময় সময়ে, এক ক্রান্তিকালে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে যখন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আসে তখন তীব্র গণআন্দোলনের মুখে হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ পদত্যাগের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন, তিনি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নাম চান।

এরশাদ আশা করেছিলেন যে, বিরোধী দলগুলো নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নাম দিতে ব্যর্থ হবে। আর সেই ব্যর্থতার প্রেক্ষিতেই তিনি আবার ফিরে আসবেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৫ দল এবং বিএনপির নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোট স্বল্পতম সময়ের মধ্যে তৎকালীন সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হিসেবে প্রস্তাব করে।

কিন্তু বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ তখন সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি। তিনি এই দায়িত্ব গ্রহণে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকৃতি জানান। তাঁর এই অস্বীকৃতি জানানোর পরপরই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি তাকে টেলিফোন করেন এবং এ দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন।

বিচারপতি শাহাবুদ্দিন প্রস্তাব করেন যে, যদি তাকে আবার স্ব-পদে অর্থাৎ প্রধান বিচারপতি পদে ফিরিয়ে আনা হয় তাহলে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে রাজি। তিন রাজনৈতিক দল তাতে সম্মত হয়। অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

নির্বাচনের পর বিচারপতি শাহাবুদ্দিনকে আবার প্রধান বিচারপতি পদে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য সংবিধান সংশোধন করা হয়। সংবিধানের একাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তাকে প্রধান বিচারপতি পদে বসানো হয়।

১৯৯৬ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানা ছুটে যান বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের বাসায়।

সেই সময় বিচারপতি শাহাবুদ্দিন প্রধান বিচারপতি পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। আর এই অবসর গ্রহণের প্রেক্ষিতেই বিচারপতি শাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

বিচারপতি শাহাবুদ্দিন সেই অনুরোধ রক্ষা করেন। আর এর প্রেক্ষিতেই আব্দুর রহমান বিশ্বাসের পর নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেই তিনি একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড শুরু করেন।

আওয়ামী লীগকে সমালোচিত করতে, বিতর্কিত করতে বিভিন্ন রকম পদক্ষেপই গ্রহণ করেন বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন যে, কবর জিয়ারত ছাড়া রাষ্ট্রপতির কোন ক্ষমতা নাই। তার এ ধরনের বক্তব্য রাজনীতিতে বিতর্কের খোরাকে পরিণত হয়। এইসবের প্রেক্ষিতে বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের ভূমিকা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠে।

রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে তিনি নীরবে-নিভৃতে গুলশানে জীবনযাপন করছিলেন। তিনি যেমন কারো সাথে যোগাযোগ রাখেননি, কেউ তার খোঁজও নেয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হলো যে, যখন বিচারপতি শাহাবুদ্দিন থাকবেন না, চলে যাবেন তখন ইতিহাস তাকে কিভাবে মূল্যায়ন করবে?

তাঁর দুটি অধ্যায়। একটি দেশের সংকটময় সময়ে তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সেই জন্য তিনি অবশ্য ইতিহাসে প্রশংসিত হবেন, অমরত্ব পাবেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় তিনি বিভিন্ন রকম বক্তব্য রেখে রাষ্ট্রপতির পদটিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিলেন। সেজন্য হয়তো তিনি সমালোচিত হবেন।

বাংলা ইনসাইডার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post সক্রিয় হচ্ছেন বেগম জিয়া
Next post জামায়াত না ছাড়লে কিছুই পাবে না বিএনপি