পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য: কূটনীতিতে দেউলিয়াত্বের আরেক প্রমাণ?

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বিভিন্ন সময় নানা রকম বেফাঁস মন্তব্য করেন এবং তাঁর অধিকাংশ মন্তব্যগুলোই কূটনৈতিক শিষ্টাচারসুলভ নয় বলে অনেকে মনে করেন।

যেমন তিনি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে বলেছিলেন, দুই দেশের সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর মতো। এটি যেমন কূটনীতিক অঙ্গনে হাস্যরসের জন্ম দিয়েছিল, আবার গণতন্ত্রের সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ না জানানো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ঢং, এই বক্তব্যটিও আনডিপ্লোমেটিক হিসেবে পরিচিত ছিল। এরকম নানা বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য আলোচিত-সমালোচিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন।

একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর যেভাবে কূটনীতির পরিভাষায় এবং কৌশলগত অবস্থান নিয়ে বক্তব্য রাখা উচিত প্রায় ক্ষেত্রে তিনি তা রাখেন না। যেমন তিনি রাখেননি সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত মিউনিখ সম্মেলনে।

এই সম্মেলনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, ‘অন্য দেশ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যখন বাংলাদেশের বিনিয়োগ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না, তখন টাকার ঝুড়ি নিয়ে এগিয়ে এসেছে চীন। তারা আগ্রাসী ও সাশ্রয়ী প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে এসেছে। এখন বিষয় হলো, আমরা কী করব?’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন গত শনিবার রাতে মিউনিখে নিরাপত্তা সম্মেলনে এই মন্তব্য করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে কোয়াডের সদস্য দেশগুলো চীনা ঋণের টোপ নিয়ে বিতর্ক করছে, সেই বিতর্কের মধ্যে যেন নতুন বিতর্ক তৈরি করলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সম্মেলনে উপস্থিত ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, কোন দেশ কার কাছ থেকে বিনিয়োগ নিবে তা ওই দেশের স্বার্থেই বিবেচনা করা উচিত।

বিশেষ করে শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ গ্রহণকারী দেশ কি পাচ্ছে তা জেনেবুঝে সিদ্ধান্ত নেয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনদিনব্যাপী মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে শনিবার রাতে আলোচনার বিষয় ছিল ইন্দো-প্যাসিফিক আঞ্চলিক ব্যবস্থা ও নিরাপত্তায় বড় পরিবর্তন। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের এশিয়া প্যাসিফিক বিষয়ক সিনিয়র ফেলো ফেলো লিন কিউক অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।

আলোচনায় অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্র সিনেটের ইউরোপ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বিষয়ক সাব-কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর জিনি শাহিন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর, অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মরিস পেইন ও জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হায়াশি ইয়োশিমাসা। এই চার দেশ কোয়াডের সদস্য।

বাংলাদেশকে সাম্প্রতিক সময়ে কোয়াডে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন আহ্বান জানানো হচ্ছে, এতে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোয়াডে যোগদান করেনি। বরং কোয়াডে যোগদান করলে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের অবনতি ঘটবে, এমন হুমকিও চীনের পক্ষ থেকে দেয়া হচ্ছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন যে, চীন টাকার বস্তা নিয়ে এসেছে -এই বক্তব্যটি পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন ধরনের অবিশ্বাস, সন্দেহ এবং অস্বস্তি তৈরি করবে বলে কূটনৈতিক মহল মনে করছে। বিশেষ করে বৈঠকে উপস্থিত ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর এ ব্যাপারে অনুষ্ঠানের মধ্যেই তাদের অভিমত ব্যক্ত করে দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ঢালাওভাবে যে চীনমুখি অর্থনৈতিক নীতি কৌশল গ্রহণ করেছে, সেটি হয়তো বাংলাদেশের প্রয়োজনীয়তা। কিন্তু একটি কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিক সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এভাবে খোলামেলা বক্তব্য কতটুকু কূটনৈতিক শিষ্টাচারসুলভ সে প্রশ্ন উঠেছে।

কারণ বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত দেশ এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক, এডিবির কাছ থেকে বেশি ঋণ নিচ্ছে। তাহলে চীন কোথায় টাকার ঝুলি নিয়ে এলো এবং কিভাবে চীন সহজ শর্তে ঋণ দিচ্ছে, এটি একটি বড় প্রশ্ন।

আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রচ্ছন্নভাবে একটি চীন প্রীতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেটি আমাদের ভারসাম্যের কূটনীতিতে একটা দ্বিধা এবং সংশয় সৃষ্টি করতে পারে। কাজেই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য কতটুকু বিবেচনাপ্রসূত, জেনেবুঝে দেওয়া -সেই প্রশ্ন উঠতে পারে।

সোর্সঃ বাংলা ইনসাইডার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post রেজা কিবরিয়া কি পরবর্তী ড. কামাল হচ্ছেন?
Next post চেয়ারম্যান-মেয়রসহ আ.লীগের ১০ নেতার একযোগে পদত্যাগ