ডানা ছাঁটা শুরু করেছে আওয়ামী লীগ

বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেওয়া দলীয় সংসদ সদস্যদের (এমপি) ডানা ছাঁটা শুরু করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, দলের পদ-পদবি পাওয়ার পাশাপাশি এমপি হয়েছেন, কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক ক্ষমতা দুর্বল করে ব্যক্তি রাজনীতি চাঙ্গা করেছেন এমন অভিযোগে অভিযুক্ত এমপিদের দলীয় পদ থেকে বাদ দেওয়ার পদক্ষেপ নিয়ে তার বাস্তবায়নও ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। এছাড়া বিতর্কিত এসব এমপিকে আগামী জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়নও দেওয়া হবে না।

অন্তত ২৯ জেলায় আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক দলীয় এমপিরাই। এর মধ্যে দুই ডজন জেলার দলীয় পদে থাকা এমপিরা দলের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন বলে আট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদকদের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এমন পরিস্থিতিতে আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে এই জেলাগুলোর দায়িত্বে থাকা এমপিদের কাছ থেকে দলীয় পদ কেড়ে নেওয়া হবে বলে কেন্দ্রীয় নেতারা জানিয়েছেন। এছাড়া তিন ডজন উপজেলায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের পদে আছেন দলের এমপিরা।

তাদেরও বেশিরভাগই দলীয় নেতাকর্মী ও এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে বিতর্কিত। এসব এমপিকেও দলীয় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে বলে জানান কেন্দ্রীয় নেতারা।

সম্প্রতি নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরীকে দলীয় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এর আগে ঢাকার এমপি হাজী সেলিমকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয় বিতর্কের জন্ম দেওয়ার কারণে।

আর সর্বশেষ গত রবিবার অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সাংসদ শফিকুল ইসলাম শিমুলকে নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে সরানো হয়। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কঠোর অবস্থানের জানান দিচ্ছেন বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় নেতারা।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধেই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আছে, তাদেরকে আমরা দলীয় পদে রাখছি না। নাটোরের শিমুল দুঃসময়ের কর্মী হলেও এমপি হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে। এজন্যই তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।’

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ২০২২-২৩ সাল আওয়ামী লীগের সংগঠন গোছানোর সময়। দেশজুড়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের সফরের মধ্য দিয়ে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সম্মেলন শেষ করা হবে।

একই সঙ্গে বিতর্কিত এমপিদের দলীয় পদ কেড়ে নেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে দক্ষ, মেধাবী ও ত্যাগী নেতাদের পদে ফিরিয়ে এনে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা হবে।

কেন্দ্রীয় নেতারা আরও বলেন, আগামী নির্বাচনে বিতর্কিত এমপিদের মনোনয়নও দেওয়া হবে না। সদ্য শেষ হওয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে দলীয় এমপিদের কর্মকাণ্ড হতাশ করেছে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে। এই নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্ত না মেনে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন অনেক এমপি।

সেজন্য বিতর্কিত ও দলের স্বার্থ পরিপন্থী কাজে সম্পৃক্ত কোনো এমপিকে আর দলীয় পদে রাখতে চান না তিনি। দলের সাংগঠনিক সম্পাদকদের বিতর্কিত ও দলের স্বার্থ পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত এমপিদের তালিকা করতে নির্দেশ দিয়েছেন শেখ হাসিনা।

দলের ভাবমূর্তি নষ্ট ও দলীয় নেতাকর্মীদের দূরে সরিয়ে রেখে যেসব এমপি ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি করছেন আগামী সংসদ নির্বাচনে তাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে না এমন অবস্থানের কথাও তিনি জানিয়েছেন কোনো কোনো দলীয় নেতাকে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী সংসদ নির্বাচনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দলীয় সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন না। সারা দেশ থেকে তথ্য চাওয়া হয়েছে কোন কোন এমপি দলের স্বার্থ পরিপন্থী কাজ করছেন, কারা দলের জন্য বোঝা।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেসব এমপির নামে গণমাধ্যমে বিভিন্ন সংবাদ পরিবেশন করা হয় সেগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখেন দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা। শুধু তাই নয়, ব্যক্তিগত পর্যায়েও খোঁজখবর নেন অভিযোগ ওঠা ওই এমপির বিরুদ্ধে। কোনো বিতর্কিত এমপি আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাবেন না এটা আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি।’

আগামী সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নের সময় বর্তমান অন্তত ১০০ এমপিকে বাদ দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তালিকা তৈরি করছেন বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য।

তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এর মধ্যে অন্তত দুই ডজন জেলা ও তিন ডজন উপজেলায় ওই এমপিরা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক বা অন্যান্য পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকদের প্রতিবেদন অনুযায়ী তাদের নেতৃত্বে দল থাকলেও ওইসব জেলা-উপজেলায় দলের চেয়ে ব্যক্তির রাজনীতি, আধিপত্য চলছে। সম্মেলন করার মধ্য দিয়ে দলের বোঝা হিসেবে যারা বিবেচিত তাদেরকে আর নেতৃত্বে রাখা হবে না।’

আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দলে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে জানিয়ে আওয়ামী লীগ সম্পাদকমণ্ডলীর আরেক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুদ্ধি অভিযান বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।

নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে এমপি শফিকুল ইসলামকে সরিয়ে দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে অন্য এমপিদেরও। এছাড়া নোয়াখালী জেলায় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে দলের জেলা কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।

সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সদর আসনের এমপি একরামুল করিম চৌধুরীকে। কিন্তু কিছুদিন বাদেই একের পর এক বিতর্ক সৃষ্টি করতে থাকেন একরাম।

গত বছরের শেষের দিকে সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সদর আসনের এমপি একরামুল করিম চৌধুরীকে ওই জেলার সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে বাদ দেওয়া হয়। এটিও বিতর্কিত এমপিদের জন্য সতর্কবার্তা।’

সম্পাদকমণ্ডলীর এই সদস্য আরও বলেন, ‘গত মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবনে আয়োজিত আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সভায় দলীয় নেতাদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বিতর্কিত কোনো এমপিকেই দলীয় পদে রাখা যাবে না।

যারা পদ নেয়, কিন্তু দলের রাজনীতি করে না, দলীয় নেতাকর্মী ও এলাকার জনসাধারণের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক, তাদেরকে দলের পদে রাখার দরকার নেই। আগামী সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নও দেওয়া হবে না।’

আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে দলের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনাই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় নারায়ণগঞ্জ জেলার রাজনীতি নিয়েও দিকনির্দেশনা দেবেন দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নারায়ণগঞ্জ জেলার সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছে।’

সম্পাদকমণ্ডলীর এই সদস্য আরও বলেন, ‘অন্য সাংগঠনিক সম্পাদকরাও জটিল জেলাগুলোর চিত্র শেখ হাসিনার কাছে জমা দিয়েছেন। দলীয় সভাপতি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন বিতর্কিত কাউকেই ছাড় দেওয়ার দরকার নেই। সংগঠনকে বড় করে দেখে সংগঠনের জন্য যা ভালো হয় তৃণমূল সম্মেলনে তাই করতে হবে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সামনে নির্বাচন। এখনই সময় বিতর্কিত এমপিদের দল থেকে বের করে দেওয়ার। যারা জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না, দলের জন্যও কাজে আসে না, তাদেরকে দল কেন বয়ে বেড়াবে?’

নাটোরে শফিকুল ইসলাম শিমুলকে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্যই বাদ দেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি সেভাবে বলব না, তবে যারা কন্ট্রোভার্সিয়াল (বিতর্কিত) তাদেরকে দলীয় পদে রাখা হবে না, সিদ্ধান্ত এমনই।’

এ প্রসঙ্গে ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমপিদের নামে ওঠা অভিযোগ ব্যক্তিগত ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করে রাখতে শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।’

একই ধরনের তথ্য জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যেখানেই সফরে যাচ্ছি সেই অঞ্চলের রাজনীতি, এমপির ভূমিকা, দায়িত্বশীল নেতা সবাই রাজনীতিতে কী ভূমিকা পালন করছেন সে সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে দলীয় সভাপতির হাতে পৌঁছাই। পরে ওনার নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করি।’

দলের সভাপতি শেখ হাসিনা দলীয় নেতাদের আমলনামা শুধু লিপিবদ্ধই করেন না, সে অনুযায়ী ব্যবস্থাও নেন বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য।

এ প্রসঙ্গে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধু ডায়েরিতে লিপিবদ্ধই করেন না, নেত্রী (শেখ হাসিনা) কারও নামে অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে অভিযোগের লিঙ্ক ওই নেতার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে পাঠিয়ে নোটিস করেন।

জানতে চান ওই অভিযোগ সম্পর্কে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তালিকা করছেন। সেই তালিকা ধরে জেলা-উপজেলা সম্মেলনে দলীয় পদ থেকে বাদ দেওয়া হবে দলের চেয়ে ব্যক্তি রাজনীতিকে প্রাধান্য দেওয়া এমপিদের।’

উৎসঃ দেশ রুপান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post টি-টোয়েন্টি দলে ডাক পেলেন মুনিম, ফিরেছেন লিটনও
Next post আওয়ামী লীগের নেতারা ভারতমুখী কেন?