রাজধানীতে আতঙ্ক!

অপরাধ। নাম শুনলেই গা শিহরে উঠে। অন্যদিকে অপরাধের ধরন পাল্টাচ্ছে রাজধানীতে। খুনোখুনির মতো অপরাধ এখন নিম্নমুখী; কিন্তু আশঙ্কাজনভাবে বাড়ছে ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ। এমনকি বাড়ছে মাদককেন্দ্রিক নানা সামাজিক অপরাধ।

মাদক-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যাও বাড়ছে। করোনার মহামারিজনিত উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতেও নারী-শিশু নির্যাতন এবং মাদকের আগ্রাসন কমেনি। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নথিবদ্ধ গত ছয় বছরের রাজধানীকেন্দ্রিক অপরাধের পরিসংখ্যান বিশ্নেষণে মেগা সিটিতে অপরাধের বাঁকবদলের এই চিত্র উঠে এসেছে।

২০১৪ সালে ঢাকায় ধর্ষণের ঘটনায় মামলা হয়েছিল ২৭৮টি। ২০২১ সালে ধর্ষণের ঘটনায় মামলা হয়েছে দ্বিগুণ- ৫৫৬টি। অর্থাৎ সাত বছরের ব্যবধানে ধর্ষণের মামলার সংখ্যা ৫০ শতাংশ বেড়েছে রাজধানীতে। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, দেশে আইন থাকলেও তার বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। এ কারণে নির্যাতনের ঘটনা কমছে না।

যারা ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনায় জড়িত, তাদের একটি অংশ ‘পাওয়ার রেপিস্ট’। এরা প্রভাবশালী অথবা প্রভাবশালীর আশীর্বাদপুষ্ট। আরেক ধরনের ধর্ষক আছে, যারা বিকৃত রুচিবোধ থেকে এসব করে। দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে পশ্চাৎপদ, ভোগবাদিতায় আকীর্ণ মূল্যবোধ ও ক্ষমতার দাপটে উচ্ছৃঙ্খল এসব মানুষজন নারীদের জন্য ভীতিকর হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, সংঘবদ্ধ এই নিপীড়নকারীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিচারপ্রত্যাশী ভুক্তভোগীর আইনি সুরক্ষার বিষয়েও আরও যত্নশীল হওয়া জরুরি। তা না হলে ভুক্তভোগীরা বিচার চাইতে আগ্রহী হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক অবস্থার সঙ্গে অপরাধ প্রবণতার ধরনের যোগসূত্র আছে। সমাজ বদলের একেকটি ধাপে একেকটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়।

আকাশ সংস্কৃতি ও পর্নোগ্রাফি হাতের নাগালে থাকায় এর এক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, অপরাধের প্রকৃতি ও ধরন বদলের বিষয়ের ওপর নজর রয়েছে। পেশাদার অপরাধ চক্র অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। তাই গুলি বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে অপরাধের প্রবণতা কমছে।

কারণ, এ ধরনের অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করার অনেক হাতিয়ার আমাদের রয়েছে। তবে সামাজিক অপরাধ, নারী ও শিশুর ওপর নির্যাতন বন্ধ করার একক দায়িত্ব পুলিশের নয়। মানবিক মূল্যবোধ তৈরি করার পেছনে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বড় ভূমিকা রয়েছে। তবে এটাও ঠিক, যারা পারিবারিক নির্যাতনের মতো অপকর্মে জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া জরুরি। ঢাকার বছরভিত্তিক অপরাধের ধরন বিশ্নেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালে প্রতিদিন গড়ে ঢাকায় ১৮টি মামলা হয়েছে।

সারা বছরে ধর্ষণের মামলা হয়েছে ৫৫৬টি। ২০২০ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫৬৯টি। ২০১৯ সালে ৫৭৮টি, ২০১৮ সালে ৩৭৮টি, ২০১৭ সালে ৩৭৫টি, ২০১৬ সালে ৩২৫টি, ২০১৫ সালে ৩১৬ ও ২০১৪ সালে ২৭৮টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। ২০১৮ সালের পর থেকে ঢাকায় ধর্ষণের ঘটনা বাড়তে থাকে।

২০১৭ সালের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, এক বছরের ব্যবধানে ২০১৯ সালে ঢাকায় এক লাফে ধর্ষণের ঘটনায় মামলা ২০০ বেড়ে যায়। ঢাকায় শিশু নির্যাতনেও দেখা যাচ্ছে একই চিত্র। ২০১৪ সালে শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয় ১৭৩টি, ২০১৫ সালে ১৮৭টি, ২০১৬ সালে ১৮০টি, ২০১৭ সালে ২৬৮টি, ২০১৮ সালে ২৮৮টি, ২০১৯ সালে ৩৮৮টি, ২০২০ সালে ৪২৬ ও ২০২১ সালে হয় ৩৮৩টি।

ষংশ্লিস্টরা বলছেন, পারিবারিক অশান্তি, চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধের পেছনের কারণ মাদক। কারণ মাদকের অর্থ জোগাতে মাদকসেবীরা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। ঢাকায় নতুন মাত্রার অপরাধের একটি বড় কারণ এই মাদক। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ সালে রাজধানীতে মাদকদ্রব্য উদ্ধারজনিত মামলা হয়েছে সাত হাজার ৬৩টি। ২০২১ সালে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ২১২টিতে।

সাত বছরের ব্যবধানে মাদক মামলার সংখ্যা বেড়েছে ১২৯.৫৩ শতাংশ। ২০১৫ সালে মাদকের মামলা হয়েছিল আট হাজার ৩৬৫টি, ২০১৬ সালে ৯ হাজার ৬২৮টি, ২০১৭ সালে ১৩ হাজার ৬৬৮টি, ২০১৮ সালে ১৬ হাজার ২১৫টি, ২০১৯ সালে ১৬ হাজার ৮৮০টি ও ২০২০ সালে ১২ হাজার ৬১৯টি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন, এক সময় ঢাকার একেকটি এলাকায় একেকটি সন্ত্রাসী গ্রুপের আধিপত্য দেখা যেত। সুব্রত বাইন, ডাকাত শহীদ, শাহাদত, কিলার আব্বাস, জিসান, শাহিন শিকদার- প্রত্যেকেই হয়ে উঠেছিল নিজ নিজ এলাকার ত্রাস। ২০০১ সালে ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর তাদের গ্রেপ্তারে শুরু হয় অভিযান। এ রকম অভিযানে ডাকাত শহীদসহ দু’জন মারা গেছেন। ১৩ জন ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে পলাতক। অন্যরা কারাগারে বন্দি। এক কথায়, এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসীদের রমরমা দাপটের দৃশ্য বদল হয়েছে।

বিপরীতে এখন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের দাপট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার কম হওয়ায় খুনোখুনির ঘটনা কমেছে। ২০১৪ সালে ঢাকায় ২৬২টি খুনের ঘটনা ঘটে। কিন্তু ২০২১ সালে খুনের ঘটনা ১৬৬টি। সাত বছরের ব্যবধানে খুনের ঘটনা কমেছে ৯৬টি। ২০১৫ সালে রাজধানীতে হত্যার শিকার হন ২২৬ জন, ২০১৬ সালে ১৬৫, ২০১৭ সালে ২১৮, ২০১৮ সালে ২১৬, ২০১৯ সালে ২০৮ ও ২০২০ সালে ২১৯ জন।

তবে ঢাকায় চুরি-ছিনতাইয়ে তেমন হেরফের হয়নি। যদিও এ ধরনের অপরাধের শিকার ভুক্তভোগীদের অনেকে পুলিশ পর্যন্ত যান না। খাতা-কলমে চুরি-ছিনতাইয়ের মামলার চেয়ে প্রকৃত ঘটনা অনেক বেশি। কারণ অনেক সময় থানার রেকর্ডে এই ধরনের ঘটনায় ‘হারানোর’ সাধারণ ডায়েরি করে এলাকার চিত্র স্বাভাবিক বলে দেখানো হয়।

ডিএমপির তথ্য বলছে, ২০২১ সালে রাজধানীতে চুরির ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ২৬টি, ২০২০ সালে ৮৭৪টি, ২০১৯ সালে এক হাজার ৮৭টি, ২০১৮ সালে ৮৬৯টি, ২০১৭ সালে ৭৮৯টি, ২০১৬ সালে ৯৫৬টি, ২০১৫ সালে ৯৬৮টি ও ২০১৪ সালে ৮৮২টি। আর ২০২১ সালে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয় ১৪৫টি, ২০২০ সালে ১৭৬টি, ২০১৯ সালে ১৫৫টি, ২০১৮ সালে ২১৬টি, ২০১৭ সালে ২১৮টি, ২০১৭ সালে ১০৩টি, ২০১৬ সালে ১৩২টি, ২০১৫ সালে ২০৫টি ও ২০১৪ সালে ২৬৫টি।

ক্যাম্পাসলাইভ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post পূর্ব ইউক্রেনে সেনা পাঠানোর নির্দেশ পুতিনের
Next post প্রকাশ্যে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ, পাঁচ বছরেও হদিস নেই ৪ আওয়ামী লীগ নেতার