জিয়া হত্যার পর ক্যান্টনমেন্ট থেকে যেভাবে পালান মনজুর

সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড নিয়ে এর আগে নানা খবর ছাপা হয়েছে। এবার জিয়া হত্যা নিয়ে চাঞ্চল্যকর নতুন তথ্য ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম’ বইয়ে তুলে ধরেছেন লেখক গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ। কয়েকজন সাবেক সেনা কর্মকর্তার জবানি নিয়ে তার লেখা এই বইটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। মানবজমিন-এর পাঠকদের জন্য জিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনার তৃতীয় পর্ব তুলে ধরা হলো-

এমপি চেকপোস্টে দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন এমদাদ। তিনি রেজার বন্ধু। কাছে এসে রেজাকে বললেন, দোস্ত, পজিশন কিন্তু ভালো না। জেনারেল এরশাদ যেভাবে মুভ করছে, সে কিন্তু মনজুরকে ছাড়বে না। আর মনজুর ও যে রকম ঘাউড়া, সে-ও এরশাদকে পাত্তা দিবে না।

একটা সংঘর্ষ হবে। সো, ইউ সেভ ইয়োর স্কিন। কাইটা পড়ো।

কী কস? জিওসি আমার, নিরাপত্তার দায়িত্ব দিছে আমারে। আমি তারে ফালায়া যামু? এইটা হয়?

দোস্ত, তুমি সিচুয়েশনটা বুঝতেছ না। সিচুয়েশন খুব খারাপ। এরশাদও ছাড়বে না, মনজুরও শুনবে না।

ক্যান্টনমেন্ট এক্সিকিউটিভ অফিসারের গাড়ি এসে থামল। গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন মেজর খালেদ। গায়ে উর্দি নেই, সিভিল ড্রেসে এসেছেন।

রেজা, কী খবর? সব রেডি?

কী রেডি?

জিওসি নাকি এখন হিল ট্র্যাক্টসে যাবেন? তাই নাকি?

হিল ট্র্যাক্টসে আছে ২১ বেঙ্গল রেজিমেন্ট। এর কমান্ডিং অফিসার হলেন জিওসির ভাগিনা লে. কর্নেল মাহবুবুর রহমান। সেখানে যাওয়া সাব্যস্ত হয়েছে। রেজার বাসায় তাঁর স্ত্রী। এ ছাড়া আছে তাঁর এক ভাগনে আর একটা কাজের ছেলে। রেজার একটা পিয়ন ছিল। সামরিক পরিভাষায় বলে রানার। রেজা তাকে ডেকে বললেন, তুমি একটা গাড়ি নিয়ে বাসায় যাও। গিয়ে বলো, গাড়িতে করে চিটাগাং শহরে কোনো আত্মীয়ের বাসায় যেন চলে যায়। আমি ডিউটি সেরে তারপর যাব।

রেজার স্ত্রী ভাগনেকে নিয়ে বের হলেন। দরজায় তালা লাগিয়ে গাড়িতে উঠলেন। গাড়ি ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে শহরের দিকে ছুটল। বিকেলে চট্টগ্রাম শহর থেকে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা নেতা এলেন ক্যান্টনমেন্টে। তাঁরা লে. কর্নেল মতি ও লে. কর্নেল মাহবুবের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁদের এককথা-এরশাদ তো ক্ষমতা নিয়ে নিচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারা কি এভাবে বসে বসে মার খাবে? এরশাদ ক্ষমতা নিয়ে নেওয়া মানে রাজাকারদের হাতে ক্ষমতা চলে যাওয়া। তখন এটা আরেকটা পাকিস্তান হবে। দেশবাসী বুঝুক আর না বুঝুক, সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা ভালোভাবেই বুঝতে পারছে যে কী হতে যাচ্ছে। মাহবুব অট্টহাসি দিয়ে উঠলেন- হা হা হা, উই হ্যাভ লস্ট দ্য ব্যাটল। তাঁর হাতে একটা কাগজ- দুর্নীতিবাজদের তালিকা। তিনি এটা কুটি কুটি করে ছিঁড়ে ফেললেন।

অজানা পথে

রাত সাড়ে আটটার দিকে জেনারেল মনজুর বাসায় যান। তাঁর সঙ্গে মেজর রেজা। রেজা সেখানে চা-নাশতা খেলেন। মনজুর তার স্ত্রীর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেন। তারপর রেজাকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন।

মনজুর একটা গাড়িতে উঠলেন। একজন অফিসার রেজাকে ডাকলেন, অ্যাই রেজা, গাড়িতে ওঠো। রেজা দেখলেন, মনজুর বসে আছেন গাড়িতে। রেজা গাড়িতে উঠলেন। গাড়িতে জেনারেলের চিহ্ন হিসেবে যে দুটো স্টার ছিল, ড্রাইভার সেটা ঢেকে দিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল। গাড়িতে তিনজন- জেনারেল মনজুর, মেজর রেজা আর ড্রাইভার। সবার পরনে ইউনিফর্ম। এমপি চেকপোস্ট পেরিয়ে গাড়ি চলল শহরের বাইরে, হাটহাজারীর পথে। কিছু দূর যেতেই মনজুর রেজাকে বললেন,

থামো, থামো।

থামব কেন? বলেন, কোথায় যাব স্যার। যেখানে বলেন, সেখানেই নিয়ে যাব।

নো নো, আই ক্যান নট মুভ উইদাউট রানা (মিসেস মনজুর)।

আল্লাহর ওয়াস্তে ফ্যামিলিটাকে একটু স্যাক্রিফাইস করা যায় না স্যার?

আমরা না মরা পর্যন্ত কেউ আপনাকে কিছু করতে পারবে না। বলেন, কোথায় যাবেন? আমরা আপনাকে সেখানেই নিয়ে যাব।

নো, আই উইল নট মুভ উইদাউট রানা।

গাড়িটা রাস্তার পাশে একটু ভেতরে গিয়ে থামল। একটু পরে জেনারেল মনজুরের স্টাফ কার পাশ কাটিয়ে সামনের দিকে গেল। ওই গাড়িতে ছিল জেনারেল মনজুরের পরিবার। তখন মনজুরকে বহনকারী গাড়ি রাস্তায় উঠে সামনের স্টাফ কারটাকে ধরার জন্য পিছু পিছু ছুটল। ড্রাইভার অনবরত হর্ন দিচ্ছে। হর্ন শুনে স্টাফ গাড়ির ড্রাইভার বুঝতে পেরে গাড়ির গতি কমাল এবং একটু পরে থেমে গেল। গাড়িতে মনজুরের স্ত্রী ও চার সন্তান এবং লে. কর্নেল দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রী ও তিন সন্তান। দেলোয়ার নেই। তিনি রয়ে গেছেন ডিভ হেডকোয়ার্টারে। মিসেস দেলোয়ার অনুযোগ করলেন, রেজা ভাই, আমার হাজব্যান্ডকে ফেলে চলে এলেন?

দেখেন, দুই দিন ধরে আমার ঘুম নাই। আমার বউ-বাচ্চার কোনো খবর নাই। আমি আপনার জামাইয়ের খবর রাখতে যাব কেন? আমি তার ধার ধারি না। আমি জিওসির ডিউটি করি।

মনজুর ধমকে উঠলেন, অ্যাই রেজা, থামো।

একটু পরে এল আরেকটা জিপ ও একটা পিকআপ। পিকআপের ভেতরে বসে আছেন লে. কর্নেল ফজলে হোসেন আর ক্যাপ্টেন জামিল হক। তাঁদের নিয়ে এসেছেন মেজর খালেদ আর মেজর রওশন ইয়াজদানী। তারা সার্কিট হাউজ অপারেশনে আহত হয়েছিলেন। চিটাগাং সিএমএইচে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। মনজুর তাদের দেখতে গিয়েছিলেন ৩০ তারিখ। মনজুর তখনই তাঁদের বলেছিলেন, তোমরা এর মধ্যে গেলে কেন?

“কী বলেন স্যার! আপনারা সবাই হিরো হয়ে যাবেন, আর আমরা বুঝি জিরো থাকব?

মিনিট দুয়েকের মধ্যে ছোটখাটো একটা মিটিং হয়ে গেল। ঠিক কর হলো, কে কোথায় যাবে । মনজুর একটা গাড়িতে উঠলেন। ড্রাইভারকে ছেড়ে দেওয়া হলো। মনজুর নিজেই বসলেন ড্রাইভিং সিটে, পাশে বসলেন মেজর গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, পেছনের সিটে মনজুরের সন্তানদের নিয়ে বসলে রেজা। স্টাফ কার ছেড়ে দেওয়া হলো, অন্য একটা জিপে উঠলেন মিসেস মনজুর, মিসেস দেলোয়ার ও তাঁর তিন সন্তান। সবার সামনে কর্নেল মতি, কর্নেল মাহবুব আর ক্যাপ্টেন মুনীরের গাড়ি। মতি এমন জোরে ড্রাইভ করছিলেন যে কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর গাড়ি চোখের আড়াল হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর শোনা গেল গোলাগুলির আওয়াজ। রাত ভোর হয়ে আসছে রেজা দেখলেন, সামনে রাস্তায় সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম পরা লোকের ছোটাছুটি করছে।

রেজার মনে খটকা লাগল। মনে পড়ে গেল গত রাতের কথা। ডিভ হেডকোয়ার্টারে শেষ মিটিংটা হয় ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহসহ। কর্নেল নওয়াজেশ তখন গাড়ি নিয়ে গেটের বাইরে যাচ্ছিলেন। আগেই একটা নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, ডিভ হেডকোয়ার্টার থেকে কেউ বাইরে যেতে পারবে না বাইরে থেকে কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হবে না। গেটে সিকিউরিটি নওয়াজেশ বললেন, আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। আমার লোকেরা যে শুভ ব্রিজের দিকে গেল, একটু খবর নিই। দেখি ওরা কে কোথায় আছে।

ব্যাপারটা রেজার চোখে পড়ল।

স্যার, কই যান?

শুভপুর ব্রিজের দিকে যাই। দেখি ওরা কেমন আছে। শুভপুর ব্রিজে কেউ আছে নাকি? সব তো হাওয়া হয়ে গেছে! আপনি ভেতরে যান, মিটিং অ্যাটেন্ড করেন। আপনি ব্রিগেড কমান্ডার। আপনাকে বাদ দিয়ে কি মিটিং হয়?

রেজার মনে হলো, নওয়াজেশ পালানোর মতলব আঁটছেন। রেজা তাঁকে আটকে দিলেন।

হান্নান শাহ ঢাকার সঙ্গে কথা বললেন। ঢাকার বার্তা একটাই- মনজুরকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে হবে।

১২ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার বের হলেন। রেজা তাঁকে বললেন, স্যার, কোথায় যাচ্ছেন?

জিওসি আমাকে একটা কাজ দিয়েছেন।

এটা আমাকে কনফার্ম করতে হবে। কারণ, আমার ওপর অর্ডার আছে, কেউ বাইরে যেতে পারবে না। কনফার্মড না হয়ে আপনাকে ছাড়তে পারব। না। কর্নেল মতি দৌড়ে এলেন।

রেজা, ওনাকে যেতে দাও। জিওসি ওনাকে একটা দায়িত্ব দিয়েছেন। রেজা পরে জেনেছেন, জিওসি যে পথে যাবেন, ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়নের সিও তাঁর ব্যাটালিয়নকে পাঠাবেন জিওসির নিরাপত্তার জন্য। তারা আসলে পথ আটকে জিওসিকে মারতে চেয়েছিল। সামনে যে গোলাগুলি হয়েছে, এটা করেছে তার ব্যাটালিয়ন। ব্যাটালিয়নের টুআইসি ছিলেন মেজর মান্নান। তাঁর নেতৃত্বে দুই ট্রাক সৈন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিল। কর্নেল মতি আর কর্নেল মাহবুব দ্রুত গাড়ি চালিয়ে তাদের ওভারটেক করে গাড়ি থেকে নামেন। তাঁদের দেখেই মেজর মান্নান বলেন, হ্যান্ডস আপ, নড়বেন না।

মান্নান, কী কও, কী করতেছ? খবরদার স্যার, নড়বেন না।

মান্নান রাইফেল কক করলেন। মতি চিৎকার করে বললেন, মাহবুব, ইউ শুট মি। মান্নান গুলি করার আগেই তুমি আমাকে মারো।

উভয় পক্ষে গোলাগুলি শুরু হয়। মান্নানের ইউনিটের একজন সুবেদার মারা যায়। ওই গোলাগুলিতে কর্নেল মতি আর কর্নেল মাহবুবও মারা যান।

ক্যাপ্টেন মুনীর একা পড়ে গেলেন। মান্নানকে উদ্দেশ করে তিনি বললেন, কী করছেন? গুলি থামান। আপনাদের বাপ আসতেছে।

বাপ মানে জেনারেল মনজুর । মান্নানের লোকেরা তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে পড়ল। মুনীর হাঁটা ধরলেন ফটিকছড়ির দিকে। ফটিকছড়ি থানায় গিয়ে সারেন্ডার করলেন। এদিকে গোলাগুলির শব্দ শুনে রেজা সতর্ক হয়ে গেলেন। জেনারেল মনজুরকে উদ্দেশ করে বললেন, স্যার, গাড়ি ঘোরান। এমন সময় আরেক বিপদ! গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট নিচ্ছে না। পেছনে একটা জিপ আর একটা পিকআপ। পিকআপে ফজলে হোসেন আর জামিল। আহত অবস্থায় সিএমএইচ থেকে তাদের তুলে আনা হয়েছে। তখনো তারা স্যালাইন নিচ্ছেন। জিপে খালেদ আর ইয়াজদানী। মনজুর, রেজা আর গিয়াস তাঁদের গাড়ি থেকে নেমে খালেদ আর ইয়াজদানীর জিপে উঠে ঠাসাঠাসি করে বসলেন। তারপর ব্যাক গিয়ার দিয়ে কিছুটা পেছনে এলেন।

ফজলে হোসেন বললেন, এ অবস্থায় আমাদের নিয়ে আপনারা কোথায় যাবেন? এখন তো হাটতে হবে। আমরা তো আহত, হাঁটতে পারব না। আসার পথে আমরা রাস্তার পাশেই একটা কাঠের দোকান দেখেছি। স্যার, আমাকে আর জামিলকে কাঠের দোকানে রেখে আপনারা চলে যান। আমাদের আর টানাটানি করার দরকার নাই। আল্লাহ ভরসা। যা হওয়ার হবে।

মিসেস মনজুর কাঁদতে কাঁদতে বললেন, তোমাদের এভাবে ফেলে যাওয়া ঠিক হবে না।

ভাবি, এখন ইমোশনাল হওয়ার টাইম না। আপনারা যান। খালেদ আর ইয়াজদানী পিকআপটাকে ব্যাক গিয়ার দিয়ে কাঠের দোকানের ঠিক সামনে নিয়ে এলেন। অন্যরা অপেক্ষা করতে থাকল। খালেদ আর ইয়াজদানী ফিরে এলেই তাঁরা একসঙ্গে রওনা দেবেন।

বেশ কিছুটা সময় পেরিয়ে গেছে। ওরা আর আসে না। মনজুর, রেজা গিয়াস, মনজুরের পরিবার আর দেলোয়ারের পরিবারের সদস্যরা হাঁটা শুরু করলেন।

টস এবং টেল

ফজলে হোসেন আর জামিলকে নিয়ে খালেদ আর ইয়াজদানী যখন কাঠের দোকানের দিকে যাচ্ছেন, তখন দেখলেন, আর্মির কয়েকটা গাড়ি আসছে এটা দেখেই খালেদ লাফ দিয়ে পিকআপ থেকে নেমে রাস্তার পাশে বনে মধ্যে ঢুকে যান। পরে তিনি ব্যাংককে চলে যান। ইয়াজদানী হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর তিনিও হাঁটতে শুরু করেন গ্রামের পথে।

পথে ইয়াজদানী এক লোকের কাছ থেকে একটা পুরোনো পাঞ্জাবি, লুঙ্গি আর গামছা কিনলেন। তারপর বনের মধ্যে ইউনিফর্ম খুলে পাঞ্জাবি, লুঙ্গি পরলেন। পাঞ্জাবির পকেটে মানিব্যাগটা রাখলেন। সামনে একটা খাল। লঙ্গি হাঁটুর ওপর তুলে খালটা পার হলেন। খেয়াল হলো যে খাল পার হতে গিয়ে পকেট থেকে মানিব্যাগ পড়ে গেছে। শুধু একটা আধুলি পড়ে আছে পকেটের এক কোনায়। কী আর করা! ইয়াজদানী হাঁটছেন তো হাঁটছেনই। একসময় চলে এলেন ফেনী রোডের কাছে। উঁকি দিয়ে দেখলেন, আর্মির কোনো গাড়ি আছে কি না। সাতসকালে এ রকম একটা উদভ্রান্ত লোককে দেখে গ্রামের এক তরুণ কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ভাই, কোনো সমস্যা? কোনো সমস্যা হলে বলতে পারেন। আমি আওয়ামী লীগ করি।

দেখেন, চিটাগাং ক্যান্টনমেন্টে তো গোলমাল হয়েছে। গোলাগুলি হচ্ছে। আমি এখন একা। কোথায় যাব বুঝতে পারছি না।

সামনে দেখবেন একটা খাম্বা। ওইটা ইন্ডিয়া বর্ডার। এক দৌড়ে বর্ডার পার হয়ে যান। বর্ডারে ওদের আপনার কথা বলবেন। আমি রোডের ওপর দাড়িয়ে ভালো করে দেখি আর্মির কোনো গাড়ি আছে কি না। আমি যখন ইশারা দেব, আপনি বর্ডারের দিকে যাবেন।

একপর্যায়ে লোকটি ইশারা দিলেন। ইয়াজদানী দ্বিধায় যাব কি যাব না। পকেট থেকে আধুলিটা বের করলেন। টস করবেন। মনে মনে ঠিক করলেন, টসে হেড উঠলে ভাগবেন, টেল উঠলে সারেন্ডার করবেন। টসে টেল উঠল। ইয়াজদানী সিদ্ধান্ত নিলেন, সারেন্ডার করবেন। তিনি রাস্তায় উঠলেন। একটা আর্মির গাড়ি গেল । ইয়াজদানী হাত ওঠালেন। গাড়ি থামল না।

মেজর মওলা একজন মুক্তিযোদ্ধা অফিসার। বিএমএ প্রথম ব্যাচ। তিনি যাচ্ছেন একটা জিপে করে। তাঁকে দেখেই ইয়াজদানী চিৎকার করে উঠলেন, মওলা, মওলা? মওলা না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছেন। ইয়াজদানী গলার সমস্ত শক্তি দিয়ে চেঁচিয়ে ডাকলেন- মওলা? গাড়িটা থামল। মওলা দেখলেন, গাড়িতে আরও সৈনিক আছে। তারা কী ভাববে? মওলা একটু ভয় পেলেন। যদি রিপোর্ট হয় যে ইয়াজদানীকে পেয়েও তিনি ছেড়ে দিয়েছেন, তাহলে সমস্যা হবে। তিনি গাড়ি ঘুরিয়ে ইয়াজদানীর কাছে এলেন। বললেন, স্যার, আপনি নাকি? খেয়াল করিনি। ডেকেছেন কেন?

মওলা, আমি সারেন্ডার করব।

কী সারেন্ডার?

মওলা বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইছেন। ইঙ্গিত দিচ্ছেন- পালাও। কিন্তু ইয়াজদানী বুঝতে পারছেন না। মওলা জানেন, সারেন্ডার মানেই ফাঁসি। এই যে ঘোষণা দিচ্ছে রেডিওতে? আমি সারেন্ডার করব।

সত্যিই আপনি সারেন্ডার করবেন?

হ্যাঁ।

ঠিক আছে, ওঠেন

পালানোর সুযোগ পেয়েও ইয়াজদানী পালাননি। নিয়তি তাঁকে টেনে নিয়েছিল গন্তব্যের দিকে।

উৎসঃ mzamin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post বিএনপির জন্য আ’লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের ৪০ মিনিট অপেক্ষা!
Next post পূর্ব ইউক্রেনে সেনা পাঠানোর নির্দেশ পুতিনের