সব ভেদাভেদ ভুলে বিএনপি এখন মাঠে

অতীত দ্বন্দ্ব ও শত্রুতা ভুলে ভোটের মাঠে বিএনপি নেতা-কর্মীরা এখন ঐক্যবদ্ধ। ঢাকার দুই প্রভাবশালী নেতা মির্জা আব্বাস ও সাদেক হোসেন খোকার আধিপত্যের লড়াই ছিল দীর্ঘদিনের। ঢাকা দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে খোকাপুত্র প্রকৌশলী ইশরাক হোসেনকে এখন পিতৃস্নেহে আগলে ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন মির্জা আব্বাস। একইভাবে আব্বাসপতিœও ইশরাকের গণসংযোগে থাকছেন সর্বাগ্রে। ডেমরা-যাত্রাবাড়ী এলাকায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির দুই নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ ও নবী উল্লাহ নবী।

সিটি ভোট ঘিরে তারাও এখন এক কাতারে এসে গণসংযোগ করছেন খোকাপুত্র ইশরাকের জন্য। থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়েও নেতা-কর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও অন্তঃকলহ ছিল। তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাও এখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভোটের মাঠে নেমে পড়েছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। শুধু খোকার সঙ্গেই নয়, ঢাকা মহানগরীর নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি হাবিব-উন নবী খান সোহেলের সঙ্গেও সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল মির্জা আব্বাসের। এখন সিটি ভোটে তাঁরা একসঙ্গে গণসংযোগ করছেন। দক্ষিণ সিটি ভোটে নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে সোহেল একজন দায়িত্বশীল নেতা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক করা হয়েছে মির্জা আব্বাসকে। ওই নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে রয়েছেন আফরোজা আব্বাসও।

তাঁরাই ভোটের প্রচারের সামগ্রিক দায়িত্ব পালন করছেন। প্রয়োজনে ইশরাককে বাসায় ডেকে আনছেন। আবার নিজেরাও ইশরাকের বাসায় গিয়ে ভোটের শলাপরামর্শ করছেন। তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা বলছেন, ভোটের প্রচারে খোকার অভাব অনেকটাই কমিয়ে দিচ্ছেন মির্জা আব্বাস। খোকার ছেলে ইশরাকের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘খোকাপুত্র ইশরাক হোসেন আমার পুত্রসম। ভালো ছেলে। সে একজন প্রকৌশলী। ঢাকার অলিগলি সবই তার চেনা। তার বাবা অবিভক্ত ঢাকার মেয়র ছিলেন। আজকে যে ঢাকার শব্দদূষণ বা বায়ুদূষণ তা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই এনেছিলেন খোকা। আমিও মেয়র থাকাকালে জলবদ্ধতা দূরীকরণসহ নগরীর সব সমস্যার সমাধান করেছি।

কিন্তু আজ ঢাকা ১৩ বছর ধরে সমস্যার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। ইশরাক হোসেন বিজয়ী হলে তার বাবা ও আমাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভালো করবে বলে আমার বিশ্বাস।’ ইশরাক হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আঙ্কেল (মির্জা আব্বাস) আমাকে সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। ভোটের প্রচার থেকে শুরু করে নির্বাচনী পরিকল্পনাসহ সব কাজেই বাবার মতো তাঁর সহযোগিতা পাচ্ছি। তিনি সব সময় শক্তি ও সাহস জোগাচ্ছেন। বাবার মতো ছায়া হয়ে আছেন আঙ্কেল।’

তিনি বলেন, ‘কেবল আঙ্কেলই নন, আফরোজা আন্টিও আমার পাশে রয়েছেন। এক কথায় অভিভাবক হিসেবে যা যা করা দরকার তার সবই পাচ্ছি আব্বাস আঙ্কেল ও আফরোজা আন্টির কাছ থেকে।’ ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিলের নির্বাচনে বিভক্ত ঢাকার একাংশ ঢাকা দক্ষিণে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন মির্জা আব্বাস। তখন তিনি নিজে নির্বাচনী প্রচার কমই চালিয়েছেন। তাঁর পক্ষে তাঁর স্ত্রী মহিলা দল সভাপতি আফরোজা আব্বাসই বেশি প্রচার চালিয়েছিলেন।

দিনভর তাবিথের গণসংযোগ : গতকাল চতুর্থ দিনেও ঢাকা উত্তর সিটিতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল গণসংযোগ করেন। মূল সড়ক পেরিয়ে অলিগলিতে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করেন তিনি। তাবিথ জনতার মাঝে লিফলেট বিতরণ করেন। বিভিন্ন ভবনের বাসা ও ছাদ থেকে মানুষের শুভেচ্ছা গ্রহণ করে হাত নেড়ে তাদের ধন্যবাদ জানান। গতকাল দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও তেজগাঁওয়ে গণসংযোগকালে তাবিথ আউয়াল সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, ‘ভোট যেন ৩০ জানুয়ারির এক মুহূর্ত আগে দেওয়া না হয়।

২৯ জানুয়ারি রাতে যেন কোনোভাবের ভোট না পড়ে। জনগণকে নিয়ে ভোটের দিন যথাযথভাবে প্রতিবাদ করতে হবে, যাতে কোনো চোরা ভোট এবার আর না পড়ে।’ তিনি বলেন, ‘জনগণ নিজের ভোট নিজে দেবে, জনশক্তিতেই আমরা বিজয়ী হব।’ দিনভর ধানের শীষের এই প্রার্থী তেজকুনিপাড়া, রেলওয়ে মার্কেট, বিজ্ঞান কলেজ, কারওয়ান বাজার, ট্রাকস্ট্যান্ড, সাতরাস্তা বেগুনবাড়ী, নাবিস্কো, শাহীনবাগ, আরজতপাড়া, নাখালপাড়া ও নিকেতন এলাকায় গণসংযোগ করেন। তিনি ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন ও কুশলাদি বিনিময় করেন।

গণসংযোগকালে তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব, যুগ্মমহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হাবিব-উন নবী খান সোহেল, সমাজসেবাবিষয়ক সম্পাদক কামরুজ্জামান রতন, ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য নিপুণ রায়চৌধুরী, ঢাকা মহানগরী বিএনপি সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ হাসান, সহসভাপতি বজলুল বাসিত আঞ্জু, যুবদল সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, স্বেচ্ছাসেবক দল সভাপতি শফিউল বারী বাবু, যুবদল উত্তরের সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী আজিজুর রহমান মোসাব্বির প্রমুখ।

হামলা মোকাবিলায় প্রস্তুত ইশরাক : নির্বাচনী প্রচারে প্রতিপক্ষের সব হামলা মোকাবিলা করতে প্রস্তুত আছেন বলে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেন। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারতের পর এ কথা বলেন তিনি। কবর জিয়ারতে অংশ নিয়েছিলেন উত্তরের মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালও। এরপর দুই মেয়র প্রার্থী দুই দিকে ছুটে যান। টিকাটুলির কে এম দাস লেনের উইমেন্স কলেজের সামনে থেকে গণসংযোগ শুরু করেন বিএনপির এই মেয়র প্রার্থী।

এরপর ফোল্ডার স্টেট রোড হয়ে জয় কালী মন্দির রোড, কাপ্তান বাজার, নবাবপুর রোড হয়ে বংশাল যুবদলের অফিসে এসে দুপুরের বিরতি দেন তিনি। এ সময় হাজার হাজার নেতা-কর্মী ধানের শীষে ভোট চেয়ে স্লোগান দেন। ইশরাক হোসেন এরপর গণসংযোগ শুরু করে নারিন্দা, সুরিটোলা, মালিটোলা, ধোলাই খাল মোড় হয়ে নারিন্দা বড় মসজিদে এসে মাগরিবের নামাজ আদায় করে বলধা গার্ডেনে প্রচারণা শেষ করেন।
এ সময় ইশরাক হোসেন বলেন, ‘যেসব এলাকায় গণসংযোগ করছি, সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা আমাদের সমর্থন করছেন।

আজকে সকাল থেকে এ পর্যন্ত বাধার সম্মুখীন হইনি। তবে আমরা আশঙ্কা করছি, বাধার সম্মুখীন হতে পারি। তাই আমরা মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। কোনো বাধা আমরা মানব না। আমাদের কাজ আমরা চালিয়ে যাব।’ ভোটারদের উদ্দেশে বিএনপির এই প্রার্থী বলেন, ‘৩০ জানুয়ারি আপনারা ভোট দিতে আসবেন। যাতে সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারেন সেজন্য আমরা মাঠে থাকব।’

About admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*